ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুপারিশ পরিকল্পনা কমিশনের * বুয়েটের কাছে সম্ভাব্যতার জন্য চিঠি লেখা হয়েছে -ডিএমডি, বিটিসিএল

বিটিসিএলের ১২৬৫ কোটি টাকার প্রকল্প ফেরত, অনুমোদনের আগেই ব্যয় বৃদ্ধি

অবশেষে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ১ হাজার ২৬৫ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব ফেরত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

বলা হয়েছে, তৃতীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করতে হবে। অনুমোদনের আগেই প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে যায় ২৪৩ শতাংশ। প্রথমবার যখন প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়, তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে পুনর্গঠিত ডিপিপিতে ৮৯৬ কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ১ হাজার ২৬৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

‘বিটিসিএলের বিদ্যমান অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল নেটওয়ার্কের উন্নয়ন ও রিং টাইপ নেটওয়ার্কে রূপান্তর’ শীর্ষক প্রকল্পে ঘটেছে এমন ঘটনা। প্রস্তাবটি নিয়ে ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। ওই সভায় অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে প্রস্তাবটি ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

কমিশনের পক্ষ থেকে পিইসি সভায় বলা হয়, নিয়ম অনুযায়ী ২৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পে আবশ্যিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করার শর্ত রয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত প্রকল্পের ডিপিপিতে সংযুক্ত সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনটি বিস্তারিত নয় বলে প্রতীয়মান হয়। কারণ, এতে শুধু প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবিত যন্ত্রপাতির ধরন, পরিমাণ ও লোকেশন উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য শামীমা নার্গিস বলেন, প্রকল্প প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাই ফেরত পাঠানো হয়েছে। আমরা বলেছি, নিজস্ব সংস্থার মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করলে হবে না। তৃতীয় কোনো সংস্থার মাধ্যমে সমীক্ষার কাজ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বিটিসিএলের ডিএমডি একেএম হাবিবুর রহমান বুধবার বলেন, আমরা আমাদের নিজস্ব কমিটির মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই করেছিলাম। কিন্তু সেটি পরিকল্পনা কমিশনের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাই তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য বুয়েটে (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) চিঠি লিখেছি। এখন তারা যদি ব্যয় কম ধরতে বলে, তা ধরা হবে। আর যদি বেশি ধরতে বলে, তহলে সেটিই হবে।

বিটিসিএল সূত্র জানায়, বিটিসিএলের বিদ্যমান অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের প্রায় সব উপজেলায় এবং এক হাজারেরও বেশি ইউনিয়নে উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কে যুক্ত করার কার্যক্রম নেয়া হয়। বর্তমানে দেশের ইউনিয়ন পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল নেটওয়ার্কের আওতায় আসা সত্ত্বেও নিরবচ্ছিন্ন আধুনিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ও উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রাখতে বিটিসিএল এই সেবা বাড়াতে চায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও রিং টাইপ নেটওয়ার্কে রূপান্তরের জন্য এ প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি নিয়ে ২০১৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রথম পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বিটিসিএলের ডিএমডি আরও জানান, প্রকল্পটি যখন তৈরি হয়, তখন ৫জি নেটওয়ার্কের চিন্তা করা হয়নি। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা আছে, ২০২১ সালের মধ্যে দেশে ৫জি নেটওয়ার্ক চালু করা হবে। সেজন্য পরবর্তী সময়ে এ প্রকল্পের আওতায় ৫জির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। তাছাড়া কাজের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। ফলে অনুমোদনের আগেই প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল। সেই সঙ্গে টেলিকমিউনিকেশন যন্ত্রপাতির কোনো রেট সিডিউল নেই। যেটি সড়ক বা অন্যান্য সংস্থার রয়েছে। আমরা যেটি করি, সেটি হচ্ছে- অন্যান্য প্রকল্পের কেনাকাটার তথ্য যাচাই-বাছাই করে পণ্যের দাম ধরে থাকি। পিইসি সভায় আমরা পরিকল্পনা কমিশনের সামনে ব্যাখ্যা দিয়েছি। তারা বলেছে, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রকল্প প্রস্তাব দিতে হবে। আমরা সেটিই করছি।

সূত্র জানায়, পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে পিইসি সভায় বলা হয়, মাত্র এক বছরের মধ্যেই প্রকল্পের কার্যপরিধি ও ব্যয় এত অধিক বৃদ্ধির বিষয়টি যৌক্তিক বলে প্রতীয়মান হয় না।

আরও বলা হয়, বিটিসিএল একটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি। কিন্তু প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রাক্কলনে কোনো নিজস্ব অর্থের প্রস্তাব করা হয়নি। সমুদয় অর্থ ইকুইটি হিসেবে সরকারের কাছ থেকে চাওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ থেকে জারি করা বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত বা আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, পাবলিক সেক্টর কর্পোরেশন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোকে স্থানীয় বা বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ প্রদানের সংশোধিত শর্তাবলিতে এটি নেই। কেননা সেখানে বলা হয়েছে, বিটিসিএলের জন্য ঋণ ও ইকুইটির অনুপাত ৬৭:৩৩ থেকে ৬০:৪০ পর্যন্ত নির্ধারণের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

পিইসি সভার কার্যপত্রে বলা হয়, পরিকল্পনা বিভাগ থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবরে জারি করা পরিপত্রের অনুচ্ছেদ ৯ ও ১০ এর শর্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের মনিটরিং সেলের ছাড়পত্র সংগ্রহ করা আবশ্যক।

কিন্তু এ প্রকল্পে জনবলের বিষয়ে অর্থবিভাগ থেকে জনবল নির্ধারণ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশ নেয়া হয়েছে। মনিটরিং সেল থেকে কোনো ছাড়পত্রই নেয়া হয়নি।

পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, ডিপিপির অনুচ্ছেদ-৯ এ প্রকল্পের অঙ্গভিত্তিক ব্যয় পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কর্মচারীদের বেতনভাতাদি বাবদ ৮ কোটি ৪২ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে, যার পুরোটাই সরকারি খাতে। প্রশাসনিক ও অন্যান্য খাতে প্রস্তাবিত ২২৬ কোটি ২৭ লাখ টাকার ব্রেকআপ দেয়া হয়নি। অঙ্গভিত্তিক ব্যয়বিভাজনে প্রস্তাবিত যন্ত্রপাতির ব্রেকআপ উল্লেখ করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় অবশিষ্ট ৩৯২ কোটি টাকার কোনো ক্রয় পরিকল্পনা দেয়া হয়নি।