ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
এক লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকায় ১১৮ প্রজেক্ট

প্রকল্পের ভারে ধুঁকছে রেল

উন্নয়ন প্রকল্পের ভারে ধুঁকছে রেল। বর্তমানে রেলওয়েতে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৯টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। এর আগে বাস্তবায়ন হয়েছে ৭৯টি উন্নয়ন প্রকল্প। এতে ব্যয় হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা।

এসব মিলে গত এক যুগে ১১৮টি প্রকল্প হাতে নেয় সংস্থাটি। কিন্তু এরপরও রেলের গতি বাড়েনি, কমেছে। এখনও চাপ বাড়লেই ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় ঘটে, দুর্ভোগ পোহাতে হয় যাত্রীদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত প্রকল্প নেয়া হলেও রেলের গতি বাড়ানোর মতো কোনো কাজ হয়নি।

হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে রেলের কাঁধে বোঝা চাপানো হয়েছে। সেই বোঝার ভার বইতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছাড়া প্রকল্প নেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে তারা মনে করেন।

জানা গেছে, রেলের উন্নয়নে শতাধিক প্রকল্প নেয়া হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান ২৯৫৫ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার কিমি. জরাজীর্ণ, সিগন্যালিং ও ইন্টার লিংক ব্যবস্থার উন্নয়ন, ২৭৮টির মধ্যে ৭৮ শতাংশ ইঞ্জিনের মেয়াদ প্রায় শেষ, ৮০ শতাংশ (আড়াই হাজার) রেলব্রিজ ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলো সংস্কারে কোনো প্রকল্পই নেয়া হয়নি।

যেসব খাতে প্রকল্প নেয়া হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-নতুন করে রেলপথ নির্মাণ, এক্ষেত্রে সদ্যসমাপ্ত রেলপথ ভেঙে নতুনভাবে নির্মাণ, মিটারগেজকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর, ব্রডগেজ লাইন বসানো, যাত্রী ও মালবাহী কোচ কেনা, ডেমো ট্রেন ক্রয়, সেলুনকার, ক্রেন কেনা ও নতুন স্টেশন ভবন নির্মাণ। এজন্য হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু নতুন বগিসহ ট্রেন যে লাইন এবং ব্রিজের ওপর দিয়ে চলাচল করবে, সেগুলোর উন্নয়ন হচ্ছে না। ফলে নতুন ট্রেন সেই পুরনো লাইন এবং ব্রিজের উপর দিয়ে ধীরগতিতেই চলছে। অথচ নতুন যাত্রী ও মালবাহী কোচ, ইঞ্জিন ১০০ থেকে ১৩০ কিমি. গতিতে চলার কথা।

শনিবার সন্ধ্যায় রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন যুগান্তরকে বলেন, অবৈধ লেভেল ক্রসিং, জরাজীর্ণ লাইন, ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজের কারণে গতি বাড়ছে না। এসব কারণে কোথাও কোথাও ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটারের উপরে তুলতে পারছে না। অত্যাধুনিক ইঞ্জিন-কোচ আনা হলেও যথাযথ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। শুধু রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ নয়, চলমান রেলপথের পুরোটাই ডাবল লাইন করতে হবে। বর্তমানে পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে ডাবল লাইন নেই। ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ডাবল লাইন রয়েছে। শনিবারও আমি পশ্চিমাঞ্চল রেলের প্রায় ২০০ কিলোমিটার রেলপথ পরিদর্শন করেছি। চলমান রেলপথের উন্নয়ন জরুরি-একই সঙ্গে ডাবল লাইন নির্মাণ। আওয়ামী লীগ সরকার ছাড়া রেলে কোনো সরকার উন্নয়ন করেনি, বরং রেলকে ধ্বংস করেছে।

চলমান ৩৯টি উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে ৫টির কাজ ৯ থেকে ১১ বছর ধরে চলছে। আরও সাতটির সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর আগে ৭৯ প্রকল্পের মধ্যে ৭৫ শতাংশের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এতে ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রেলের নিজস্ব কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ৫ থেকে ৮ কর্মকর্তা এর সঙ্গে জড়িত। নিজেদের নির্ধারিত কাজের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্বেই তারা বেশি সময় দেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ সামছুল হক যুগান্তরকে বলেন, রেলের প্রকল্পগুলো জনগণের উন্নয়নের জন্য নয়। অপরিকল্পিত-সুদূরপ্রসারীহীন প্রকল্পে যেমন মান থাকছে না, উন্নয়নের সুফলও পাচ্ছে না সাধারণ জনগণ। প্রকল্প ঘিরে দুর্নীতি-অনিয়ম পদে পদেই রয়েছে। কোচ কেনা হলেও-সামঞ্জস্য রেখে ইঞ্জিন কেনা হচ্ছে না। চলমান রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ না করে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে উঠছে সংশ্লিষ্টরা। ভুল পথে টাকা খরচ করায় দিন দিন ট্রেনের গতি কমছে, সেবা-নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না।

রেলওয়ে অপারেশন দফতরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অধিকাংশ উন্নয়ন প্রকল্পেই অপারেশন দফতরের সংশ্লিষ্টদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। সব ঠিকঠাক করার পর কিছু প্রকল্পের কাগজপত্র পাঠানো হয় এ দফতরে। অথচ অপারেশন দফতরই যাত্রীদের সেবা-নিরাপত্তা নিশ্চিতের সঙ্গে পুরোপুরি সম্পৃক্ত। যাত্রীদের যত অভিযোগ তাদেরই শুনতে হয়। তিনি বলেন, একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করার পরও ট্রেনের যেমন গতি বাড়েনি, তেমনি কমেনি লোকসানও। বাধ্য হয়েই ট্রেনের ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে হয় তাদের।

রেলের একাধিক সূত্র জানায়, নতুন প্রকল্পে নজর দেয়া হলেও চলমান রেললাইন, সেতু, আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া ইঞ্জিন, যাত্রীবাহী কোচ রক্ষণাবেক্ষণে উদাসীনতা সবচেয়ে বেশি। বিদ্যমান রেলপথে ছোট-বড় সেতু আছে ৩ হাজার ১৭৪টি। এর মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার সেতু ঝুঁকিপূর্ণ। ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই হাজার কিমি. জরাজীর্ণ রেললাইন চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ সেতু মেরামতসহ প্রয়োজনে নতুন নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বছরব্যাপী সমীক্ষায় উঠে এসেছে ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতুসহ জরাজীর্ণ রেললাইন যথাযথ মেরামত জরুরি। এতগুলো প্রকল্পের পর এখন উল্লিখিত বিষয়ে আরও তিন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ সেতু, রেললাইন ও পুরনো স্টেশন মেরামতসহ মোট তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়নে ১০ হাজার কোটি টাকার উপরে খরচ হতে পারে বলে জানা গেছে।

বর্তমানে রেলে ২৭৮টি ইঞ্জিন রয়েছে। এর মধ্যে মিটারগেজ ১৮৮টি ও ব্রডগেজ ৯০টি। রেলের ইঞ্জিনের সাধারণ আয়ুষ্কাল (ইকোনমিক লাইফ) ধরা হয় ২০ বছর। সে হিসাবে বর্তমানে রেলের ৭৮ শতাংশ ইঞ্জিনই মেয়াদোত্তীর্ণ। স্বাধীনতার আগে কেনা ৯৫টি ইঞ্জিনের বয়সকাল ৪৯ থেকে ৬৯ বছর। এসব ইঞ্জিন দিয়ে ৪০ কিলোমিটারের উপরে গতি ওঠালে চলন্ত অবস্থায় ইঞ্জিন অচল হয়ে পড়ে। এসব কারণে সম্প্রতি পশ্চিমাঞ্চল রেলে প্রায় ৪ কোটি টাকা খরচ করে একটি ইঞ্জিন মেরামত করার মাত্র ৩ মাসের মাথায় অকেজো হয়ে পড়ে।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক সরদার শাহাদত আলী যুগান্তরকে জানান, পূর্বাঞ্চলে ইঞ্জিন ও কোচের সংকট রয়েছে। পুরনো ইঞ্জিন-কোচ দিয়ে গতি বাড়ানো সম্ভব নয়। শুধু আধুনিক ইঞ্জিন-কোচ হলেই হয় না, রেলপথও যথাযথ হতে হয়। গড়ে ঘণ্টায় ৬৬ কিলোমিটার গতি নিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। অত্যাধুনিক ইঞ্জিন-কোচের সঙ্গে রেলপথ, সিগন্যালিং ব্যবস্থা উন্নয়নসহ বন্ধ স্টেশন চালু করতে হবে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক পরিচালক মিহির কান্তি গুহ যুগান্তরকে জানান, পশ্চিমাঞ্চলে অত্যাধুনিক কোচ রয়েছে, যেসব কোচ দিয়ে ১২০/১৩০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালানো সম্ভব। কিন্তু উপযুক্ত রেলপথ না হওয়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না। ১ হাজারের বেশি অবৈধ লেভেলক্রসিং যেন একেকটি মরণফাঁদ। এছাড়া এখনও নন-ইন্টারলকিং সিস্টেম রয়েছে রেলে। দুর্বল রয়েছে সিগন্যালিং ব্যবস্থাও। এসবে নজর বাড়াতে হবে, বরাদ্দ বাড়াতে হবে। তাহলে গতি দিন দিন বাড়বে।

রেলওয়ে মেকানিক্যাল দফতর সূত্রে জানা যায়, পুরো রেলপথেই পাথরের স্বল্পতা রয়েছে। একই সঙ্গে রেললাইন, স্লিপার, নাট-বল্টু জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে বছরের পর বছর। রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত বরাদ্দ হয় না। সংশ্লিষ্টরা নতুন রেললাইন নির্মাণে তৎপর থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণে চরম উদাসীন। অপরদিকে প্রকৌশলী দফতরের অভিযোগ, রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণ করতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হলে মাঠ পর্যায়ে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের কাজ হচ্ছে না। লাইন রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিতে ২টি বিশেষ ‘ট্যাম্পি মেশিন’ কেনা হলেও ব্যবহার হচ্ছে না। অথচ এক একটি মেশিন প্রায় ৩০ কোটি টাকা করে কেনা হয়। ফলে পয়েন্টম্যান, গ্যাংম্যানরা দায়সারা অবস্থায় শুধু লাইনে চোখ বুলিয়েই দায়িত্ব শেষ করছেন।

শনিবার রেলপথ সচিব মো. সেলিম রেজা যুগান্তরকে বলেন, বিগত এক যুগে রেলে বহু উন্নয়ন প্রকল্প সমাপ্ত হয়েছে, চলমান আছে ৩৯টি। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জরাজীর্ণ রেলপথ ও ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতু রক্ষণাবেক্ষণসহ নতুন নির্মাণ এবং রেলপথ সংশ্লিষ্ট সিগন্যাল, ইন্টারলকিং, লেভেলক্রসিং উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ করতে যাচ্ছি। অত্যাধুনিক দ্রুতগতিসম্পন্ন রেল ইঞ্জিন, যাত্রীবাহী কোচ আনা হলেও রেলপথের কারণে প্রকৃত গতি উঠানো যাচ্ছে না। তবে দিন দিন তা উন্নত হচ্ছে। আগামী ৪-৫ বছরের মধ্যে এমন সমস্যাগুলো দূর করা হবে। তিনি বলেন, সুদূরপ্রসারী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। এ ধরনের পরিকল্পনায় আগামী উন্নয়ন প্রকল্পগুলো গ্রহণ করা হবে। যাতে শতভাগ সুফল পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) ধীরেন্দ্রনাথ মজুমদার জানান, রেললাইন, সেতুসহ জরাজীর্ণ রেলপথ শতভাগ মেরামত করতে আমরা দুই অঞ্চলে দুটি প্রকল্প গ্রহণ করছি। বর্তমানে যে ৩৯টি চলমান উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে, সেগুলোর বাইরে এ দুটি প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। বর্তমানে পুরো রেলপথে মাত্র ১২ টন এক্সেল লাইন রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে তা বেড়ে ২৫ টনে পৌঁছবে। ফলে মিটারগেজ ট্রেন ১০০ কিলোমিটার এবং ব্রডগেজ ট্রেন ১২০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার গতি নিয়ে চালানো সম্ভব হবে। এখন গতিসম্পন্ন অত্যাধুনিক ইঞ্জিন-কোচ আনা হলেও সেই গতিতে ট্রেন চালানো সম্ভব নয়-কেবল উপযুক্ত রেলপথ না হওয়ার কারণে।