ঢাকা, বুধবার, ২২শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ঈদের অনুষ্ঠানে মমতা, সিএএ নিয়ে হুঁশিয়ারি

সামনেই ভারতের লোকসভা নির্বাচন। দেশটির ৫৪৩ আসনে ভোট নেওয়া হবে সাত দফায়। প্রথম দফায় নির্বাচন ১৯ এপ্রিল, শেষ দফার ১ জুন। ফল গণনা ৪ জুন। এরই মধ্যে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরা তাদের নিজেদের মতো করে প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন। তাদের লক্ষ্য ভোটারদের কাছে টানা, জনসংযোগ বাড়ানো। আর সেই লক্ষ্যে ‘ঈদ‘ উৎসবেও প্রচারণার সরব থাকতে দেখা গেল দলগুলোকে।

আজ শনিবার মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরের দিনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আনন্দ মাতলেন ডান-বাম সমস্ত দলের প্রার্থীরা। সেই সাথে সুকৌশলে মুসলিম ভোটারদের সাথে জনসংযোগও সারলেন তারা। রাজ্যে ঈদের সবচেয়ে বড় ঈদ জামাতটি হয় কলকাতার রেড রোডে। এখানে ঈদের নামাজ আদায় করেন প্রায় লাখো মুসল্লি। আর সেই নামাজে অংশ নিয়ে মুসলিমদের প্রশংসা করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। সেই সাথে তাদের পাশে থাকার বার্তাও দেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী।

মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রশংসা করে মমতা বলেন, ‘আপনাদের ঈমানদারি আমাদের এই রাজ্যে মা-মাটি-মানুষকে অনেক শান্তিতে রেখেছে, ভালো রেখেছে। আপনারা শান্তিতে থাকবেন, স্বস্তিতে থাকবেন। আপনাদের জীবনের নিরাপত্তার দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। আমরা থাকতে আপনাদের উপর কেউ কোনরকম অত্যাচার করতে পারবে না।’

 

এসময় নিজের ভাতিজা ও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি, রাজ্যের মন্ত্রী জাভেদ খান, সাবেক সাংসদ ইমরান হাসানকে সাথে নিয়েই রাজনৈতিক বার্তাও দেন রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান। তাকে বলতে শোনা যায় ‘আপনাদের আশীর্বাদ, দোয়ার কারণেই আমরা এখানে (ক্ষমতায়) রয়েছি। আমি এখনো বলবো নির্বাচনের সময় এরাজ্যে আমাদের লড়াই বিজেপির বিরুদ্ধে। তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়া একটা ভোটও যাতে অন্য কোন দলে না যায় সেটা লক্ষ্য রাখতে হবে।’

এসময় মমতা ব্যানার্জি ও তৃণমূলের নামে অনবরত স্লোগান দেওয়া হয়। এ সময় মমত ব্যানার্জি আরও বলেন ‘আপনাদের পরিবারের সদস্য যারা বাইরে কাজ করে তাদেরকে বলবেন তারা যেন রাজ্যে এসে ভোটটা দিয়ে যায়। তা না হলে তাদের নামগুলো কেটে দেবে।’

‘সংশোধিত নাগরিক আইন’ (সিএএ) এবং ‘জাতীয় নাগরিক পঞ্জি’ (এনআরসি) নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যে আতঙ্ক আছে বলে অভিযোগ তা নিয়ে সংখ্যালঘুদের পাশে থাকার বার্তা দেন মমতা। তিনি সিএএ নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আপনাদের জীবন, আপনাদের নিরাপত্তাই আমার কাছে অগ্রাধিকার। আমি জানি অনেকের মধ্যে প্রশ্ন আছে এনআরসি, সিএএ হবে কিনা। কিন্তু আমি জানিয়ে দিতে চাই কোন সিএএ, এনআরসি বা অভিন্ন দেওয়ান বিধিও (Uniform Civil Code) করতে দেওয়া হবে না। আমরা এটা মানবো না।’

ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, আমার অনেকগুলো কর্মসূচি ছিল কিন্তু সেগুলোকে বাদ দিয়ে আমি এখানে এসেছি।

এসময় বিজেপিকে ইঙ্গত করে মমতা বলেন, ‘নির্বাচন আসলেই কেউ কেউ (বিজেপি) ইডি, সিবিআই, ইনকাম ট্যাক্স দিয়ে ভয় দেখায়। আমরা বলি এর থেকে ভালো হয়, আপনারা একটা জেলখানা বানিয়ে দিন ওখানে সব লোক চলে যাবে। কিন্তু ভারত ১৪০ কোটি মানুষের দেশ, আপনি কি সবাইকে জেলে ঢুকাতে পারবেন? আমরা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মতো লড়াই করি। আমরা দেশের জন্য রক্ত দিতে প্রস্তুত কিন্তু অত্যাচার ছড়ানোর জন্য আমরা প্রস্তুত নই।’

এসময় ঈদের জামাত শেষেই মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের সাথে কুশল বিনিময় করেন মমতা। সেই সাথে ছোট ছোট বাচ্চাদের আদর করেন- কাউকে কোলে তুলে নেন। মমতার পাশাপাশি তার দলের নেতারাও বিভিন্ন জায়গায় ঈদ উৎসবের মেতে উঠেন। পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোল মুরগাসল ঈদগাহে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী মলয় ঘটক।

হাওড়ার তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী প্রসূণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও স্থানীয় ভোট বাগান অঞ্চলে মুসলমান ভাইদের সঙ্গে ঈদের খুশি ভাগাভাগি করে নেন। অপরদিকে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার টিটাগড়ে বাংলা জামা মসজিদের পক্ষ থেকে বিটি রোডের উপর ঈদের নামাজে উপস্থিত ছিলেন ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী ও দলের প্রভাবশালী নেতা অর্জুন সিং। একই ঈদের নামাজে উপস্থিত ছিলেন ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী ও রাজ্যের সেচ মন্ত্রী তথা পার্থ ভৌমিক। সাথে ছিলেন পরিচালক ও ব্যারাকপুরের বিধায়ক রাজ চক্রবর্তী, টিটাগড় পৌরসভার পৌর প্রধান কমলেশ সাউ, উপ পৌর প্রধান মোহাম্মদ জলিল সহ টিটাগড় পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলাররা। এসময় মুসল্লিদের সঙ্গে কোলাকুলি করে সৌজন্য বিনিময় করেন পার্থ ভৌমিক ও রাজ চক্রবর্তী প্রমুখ।

এদিন সকালের দিকে বাঁকুড়া শহরের মাচানতল মসজিদে জনসংযোগ আর ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা যায় বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রের সিপিআইএম প্রার্থী আইনজীবি নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত ও তৃণমূল প্রার্থী অরুপ চক্রবর্ত্তীকে। সেখানে দু’জন দু’জনকে দেখে কোলাকুলির পাশাপাশি ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তারা।

ওই একই ছবি দেখা গেল উত্তর ২৪ পরগনার জেলার কামারহাটিতে। এখানকার ছাইগাদা ময়দানে উপস্থিত ছিলেন দমদম লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী সৌগত রায় ও ওই কেন্দ্রের সিপিআইএম প্রার্থী সুজন চক্রবর্তী। দুই প্রার্থীই তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে শুভেচ্ছা জানান। পরে তারা উভয়ে নিজেদের মধ্যে সৌজন্য বিনিময় করেন।

পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের প্রায় ৩০% ভোটার মুসলিম সম্প্রদায়ের। ফলে প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য থাকে এই সংখ্যালঘু ভোটকে কাছে টানার। অনেকেই বলে থাকেন মুসলিম ভোট যার, রাজনৈতিক ক্ষমতা তার, সরকার তার।