ঢাকা, রবিবার, ২৮শে নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

কপ২৬: জলবায়ু সহনশীল টেকসই নগর উন্নয়নের তাগিদ

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নগরে যেসব সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে তা মোকাবিলা করে অর্ন্তভুক্তিমূলক , জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ফলপ্রসূ অভিযোজন কৌশল নির্ধারণে স্থানীয় ভৌগোলিক জ্ঞানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভূ-প্রাকৃতিক ও জনমিতিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় প্রয়োজন, বিশেষ করে দরকার স্থানীয় উদ্ভাবন। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে স্থানীয় সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল কর্মকৌশল সম্পৃক্তকরণ একান্ত জরুরী।
জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনকে (কপ-২৬) সামনে রেখে রাজধানীতে এক জাতীয় পর্যায়ের সংলাপে নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা এসব কথা বলেন।

এসময় বক্তারা জলবায়ু উদ্বাস্তু বান্ধব শহর গড়ে তোলার পাশাপাশি জলবায়ু সুশাসন বিশেষ করে জলবায়ু তহবিলের সঠিক ব্যবহারের উপর গুরুত্বারোপ করেন।
বৃহস্পতিবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে আর্ন্তজাতিক দাতব্য সংস্থা ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ ও প্রতীকি যুব সংসদের যৌথ উদ্যোগে ‘কপ২৬-এর জন্য বাংলাদেশের শহুরে সমাজের কন্ঠস্বর’ বিষয়ক জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আকমল শরীফ।
নভেম্বর মাসে যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো শহরে অনুষ্ঠিতব্য কপ-২৬ ঘিরে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ ও অংশীজন বিশেষ করে শহরে বসবাসরতদের জীবনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত এবং জীবিকায় প্রভাব এবং মানিয়ে নেয়ার পদ্ধতিগুলোকে নিরুপণকরে জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশেন প্রোগ্রাম ম্যানেজার মইন উদ্দীন আহমেদ এবং ১০টি শহর পর্যায়ে পরিচালিত নাগরিক পরমর্শসভা ও দলীয় আলোচনার তথ্য উপাত্ত তুলে ধরেন মহি উদ্দীন আহমেদ। এই পরামর্শ সভাগুলোর মাধ্যমে জলবায়ু বিপদাপন্ন এলাকাগুলোর বিশেষত শহর অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থান, জলবায়ু জনিত ঝুঁকি ও বিপদাপন্নতাসমূহ, স্থানীয় সমাজ ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোজন স্বক্ষমতা নিরুপণের পাশাপাশি ক্ষয়-ক্ষতি, জলবায়ু স্থানাস্তর ব্যবস্থাপনা এবং অভিযোজন তহবিলের বরাদ্দ ও যর্যাথ ব্যবহার বিষয়ে নাগরিক সমাজ ও অংশীজনদের অগ্রাধিকারসমূহ মূল্যায়ন করা হয় যা জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনের সময়ে প্রচার করা হবে।
রাজধানী ঢাকাসহ মোট ১০টি মহানগর ও শহর এলাকায় ( চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী, কক্সবাজার, জামালপুর, সুনামগঞ্জ, পটুয়াখালী ও সাতক্ষীরা) একটি করে দলীয় আলোচনা ( ফোকাসড গ্রুপ ডিসকাসন) এবং ৪টি অংশীজন সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয়। ১০টি দলীয় আলোচনা এবং ৪০টি সাক্ষাৎকার থেকে প্রাপ্ত তথ্য সমন্বিত করে জাতীয় সংলাপে উপস্থাপন করা হয়।
সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা’র সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. শওকত বেগম, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) জলবায়ু বিশেষজ্ঞ একেএম মামুনুর রশিদ, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার  ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ এন্ড ডেভেলপমেন্টের উপ-পরিচালক মিজান আর খান, নগর জলবায়ু বিশেষজ্ঞ সরদার শফিকুল ইসলাম, ডিজাস্টার ফোরামের  সদস্যসচিব গওহার নঈম ওয়ারা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সূচিতা শারমিন, সেভ দ্য চিলড্রেনের উপপরিচালক ড. নাজমুন নাহার, প্রতীকি যুব সংসদের নির্বাহী প্রধান সোহানুর রহমান, একশনএইডের অমিত দে প্রমুখ। অনলাইন আলোচনায় যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ সেন্টার ফর আডভান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ড. আতিক রহমান, ব্র্যাকের ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ডের হেড গোলাম রব্বানী এবং বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব ধরিত্রী কুমার সরকার।
এসময় নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত নাগরিক সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন পৃথিবী ও মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন। এ সংকটের বিরুপ প্রভাব পড়ছে গ্রাম ও শহরের মানুষের জীবন ও জীবিকায়। জলবায়ু পরিবর্তন জনিত নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে বাড়ি-ঘর, জীবিকা হারিয়ে ভিড় জমাচ্ছে শহরগুলোতে। এতে শহরে জলবায়ু বাস্তুচুত্য মানুষদের বসবাস বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রভাব পড়ছে নাগরিক জীবনে, মান কমছে নাগরিক পরিষেবার। এই পরিস্থিতি এখন সংকটে রুপ নিচ্ছে।

বক্তারা আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগামী দু’দশকের মধ্যে এক কোটি মানুষ রাজধানীতে চলে আসবে বলে বিভিন্ন গবেষনায় উঠে এসেছে। ঢাকা বা বড় নগরগুলোতে আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে যে উদ্বাস্তুরা আসবে তা গ্রহণ করার মত কোন সক্ষমতা নেই। এজন্য ২০৩০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে কার্যকর যুগোপযোগী উদ্যাগ নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী অর্ন্তভুক্তিমূলক পরিকল্পনা এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন। এটা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি খাতে যৌথ মনিটরিং দক্ষতা বাড়াতে হবে।

প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. শওকত বেগম বলেন, নগরে জলবায়ু জনিত দুর্যোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নগর কেন্দ্রিক জলবায়ু পরিকল্পনা থেকে নারী, শিশু, যুব, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কাউকে বাদ দেয়া বা পিছিয়ে রাখা যাবে না। স্থানীয় পর্যায়ে অর্থায়ন বাড়াতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয়, জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) জলবায়ু বিশেষজ্ঞ একেএম মামুনুর রশিদ স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজন, পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ণের প্রাপ্যতা এবং মানবাধিকার ইস্যুতে গুরুত্বারো করেন। তবে তিনি মনে করেন সবকিছুতে জলবায়ু পরিবর্তনকে দোষারোপ না করে অভ্যন্তরীন সুশাসন নিশ্চিত করলে অনেক সমস্যার সমাধান সহজ হবে। শুধু জলবায়ু তহবিল দিয়ে সব সমস্যার সমাধান মিলবে না।

ডিজাস্টার ফোরামের  সদস্যসচিব গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, আমরা নদী ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হয়েছি। জলবায়ু পরিবর্তন এখন প্রাণের সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে বরিশাল ও পটুয়াখালী অঞ্চলে ডাইরিয়ার মত পানিবাহিত রোগ দেখা দিচ্ছে। ডেঙ্গুর প্রকোপও বাড়ছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ নাগরিকদের ব্যক্তিগত পর্যায়েও দায়িত্ববান হতে হবে। জলবায়ু ব্যবস্থাপনায় আমাদেও প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে। জলবায়ু তহবিলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা টাকা খরচ করতে জানি না। সামনের দিকের অবস্থা আরো খারাপ হতে পারে। আমাদের সদিচ্ছার সঙ্গে দরকার স্থানীয় সমস্যার স্থানীয় সমাধান।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার  ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ এন্ড ডেভেলপমেন্টের উপ-পরিচালক মিজান আর খান বলেন, নগর জীবনে সুপেয় পানির সমস্যা সমাধানে কার্যকর সুশাসন ব্যবস্থার বিকল্প নেই। নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার বিশেষকরে সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভার ভূমিকা অনেক গুরুত্বপুর্ন। এগুলো ‘মিনি পার্লামেন্ট’র মত কাজ করতে পারে। তাই স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে উদ্যোগ নিতে হবে। বড় নগরগুলোর পাশাপাশি শহরগুলোকে জলবায়ু উদ্বাস্তু বান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আকমল শরীফ বলেন, তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যত সুরক্ষায় বিশ্বনেতাদের এগিয়ে আসতে হবে। কপ২৬ সম্লেলনে শুধু কথা নয়, জরুরী ভিত্তিতে কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। অভিযোজনের সীমা পার হয়ে গেলে যে সংকট তৈরি হবে তা মোকাবিলা করা সম্ভব নয় এবং অনেক ব্যয়সাপেক্ষ হবে। তাই এখনই কার্বণ নির্গমণ হ্রাস করা এবং জলবায়ু জনিত ক্ষয়-ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পর্যাপ্ত আর্থিক এবং কারিগরি সহায়ত প্রদানে বিশ্ব সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে তিনি আহবান জানান।

প্রতীকি যুব সংসদের নির্বাহী প্রধান সোহানুর রহমান বলেন, শহুরে জীবনে তরুণরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে নানাভাবে বিপদাপন্ন। বাড়ছে নারী ও মেয়েদের প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিয়ে। বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে তাদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, পানীয় জলের অধিকার। বঞ্চিত হচ্ছে বিকাশ ও শোভন কর্মসংস্থান থেকে। অনেক তরুণ জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছে। তাদের সহনশীলতা বৃদ্ধিতে যৌথভাবে সমন্বিত কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।