জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

‘বন্ধ’ ক্যাম্পাসও উত্তাল ভিসির পদত্যাগ দাবিতে

বৃহস্পতিবার, ০৭ নভেম্বর ২০১৯ | ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ | 22 বার

‘বন্ধ’ ক্যাম্পাসও উত্তাল ভিসির পদত্যাগ দাবিতে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে গতকাল বুধবারও উত্তাল ছিল ক্যাম্পাস। প্রশাসনের বন্ধ ঘোষণা করা ক্যাম্পাসে দিনভর বিক্ষোভ মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি, সংহতি সমাবেশ হয়েছে। উপাচার্যবিরোধী স্লোগান উঠেছিল সর্বত্র। পাশাপাশি আন্দোলন থামাতে তৎপর ছিল প্রশাসনও। প্রশাসনের নেওয়া শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত অনেকে হলে অবস্থান করেন। কিন্তু প্রশাসন এদিন বিকেল সাড়ে ৩টার মধ্যে আবারও হল খালি করার নির্দেশ দিয়ে বিকেল থেকে জোর করে তাঁদের হল থেকে বের করা শুরু করে। এ রকম পরিস্থিতিতেও রাত ৯টায় উপাচার্যের বাসার সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।

সন্ধ্যার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ হলের প্রধান গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সব দোকানপাট। এতে আতঙ্ক দেখা দেয়। কোনো কোনো হলে নির্ধারিত

সময়ে শিক্ষার্থীরা হল না ছাড়ায় হল প্রশাসন জোর করে তাঁদের বের দেয়। নারী শিক্ষার্থীদের যে কটি হলের প্রাধ্যক্ষরা উপাচার্যবিরোধী সেসব হলের ছাত্রীরা হলেই অবস্থান করছিলেন। প্রথম ঘোষণায় ছাত্রলীগের কোনো নেতাকর্মী হল ত্যাগ না করলেও পরবর্তী ঘোষণার পর তাঁরাও হল ছেড়ে গেছেন।

এদিকে ক্যাম্পাসের ভেতরে সভা-সমাবেশ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ অফিস থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘এরই মধ্যে শিক্ষার্থীরা হল ত্যাগ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে দোকানপাট বন্ধ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মনে করে এই সময় ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে কোনো শিক্ষার্থীর অবস্থান সমীচীন নয়। ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থানরত কোনো শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে এসে সভা-সমাবেশ, মিছিল কিংবা কোনো অফিস বা আবাসিক এলাকায় অবস্থান করতে পারবে না।’

তবে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এই অফিস আদেশকে প্রত্যাখ্যান করে আজকের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। কর্মসূচির মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় পুরনো প্রশাসনিক ভবনের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল পালন করা হবে। এ ছাড়া আজ সন্ধ্যা ৬টায় উপাচার্যের বাসভবনের সামনে প্রতিবাদী কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে।

আগের দিন মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে সব শিক্ষার্থী হল ছেড়ে না যাওয়ায় গতকাল দুপুরে পুনরায় বৈঠকে বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রভোস্ট কমিটি। কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের এদিন বিকেল সাড়ে ৩টার মধ্যে সবাইকে হল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। বিকেল ৫টার পর থেকে হলগুলোতে পুনরায় তালা লাগানো শুরু হয়। গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আ ফ ম কামালউদ্দিন হল, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল, মওলানা ভাসানী হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলসহ আবাসিক হলগুলোয় তালা লাগানো চলছিল। এ সময় হলগুলোতে অবস্থান করা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বের হয়ে যেতে দেখা গেছে।

এদিকে মেয়েদের যে হলগুলোর তালা মঙ্গলবার রাতে ভাঙা হয়েছিল সেগুলো মেরামত করে পুনরায় তালা দেওয়া হয়েছে বলে কালের কণ্ঠকে সন্ধ্যায় জানিয়েছেন প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক বশির আহমেদ।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল সকাল ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মুরাদ চত্বর থেকে আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের অপসারণ দাবি করে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। এ সময় কয়েকটি হলের ছাত্রীদের হল থেকে আন্দোলনে অংশ নিতে বাধা দেয় এবং তাঁদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখে হল প্রশাসন। এ সময় আন্দোলনকারী ছাত্ররা মুরাদ চত্বর থেকে মিছিল নিয়ে নারী হলগুলোতে গিয়ে ছাত্রীদের হল থেকে বের করে আনেন। পরে তাঁদের সম্মিলিত বিক্ষোভ মিছিল ক্যাম্পাসের সব স্থাপনা ঘুরে ১২টার দিকে পুরনো প্রশাসনিক ভবনের সামনে উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে পৌঁছে। সেখানে সড়ক অবরোধ ও সংহতি সমাবেশ করা হয়।

সংহতি সমাবেশে বিভিন্ন বিভাগের দুই শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অংশ নেন। আন্দোলনকারীদের ওপর আগের দিনের হামলার প্রতিবাদে সেখানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন কলা ও মানবিকী অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোজাম্মেল হক, জাতীয় তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খানসহ ছয়জন সিনেটর এবং সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবিরপন্থী শিক্ষকরা। সমাবেশে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের দুর্নীতি, ছাত্রলীগ দিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা এবং আবাসিক হলগুলো বন্ধের প্রতিবাদ জানান।

এর আগে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নতুন প্রশাসনিক ভবনে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিস করতে প্রবেশ করলে আন্দোলনকারীরা তাঁদের বের করে দিয়ে ভবনে তালা মেরে দেন।

সংহতি সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘উপাচার্য ছাত্রলীগের হামলাকে গণ-অভ্যুত্থান বলেছেন। কিন্তু প্রকৃত গণ-অভ্যুত্থান ঠেকাতে হল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উপাচার্য হল খালি করে সরকারকে বোঝাতে চেয়েছেন উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে এটা করা হয়েছে। কিন্তু এর সমাধান হল খালি করা নয় বরং উপাচার্যের গদি ছাড়া। আশা করি উপাচার্যের বিষয়ে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্তে আসবে। সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে শিক্ষার্থীদের পেটানোয় তাঁর (উপাচার্য) নৈতিকতার পূর্ণ অবক্ষয় হয়েছে। ফলে উপাচার্য তাঁর পদে থাকার নৈতিক অবস্থান হারিয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক ব্যবসায়ী ও পুলিশের ভূমিকা নিয়েছেন। আর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিসি নিয়োগ আইয়ুব খানের অধ্যাদেশ অনুযায়ী চলছে। যার ফলে ভিসি নিয়োগ সরকারের কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে।’

দর্শন বিভাগের অধ্যাপক কামরুল আহসান বলেন, ‘প্রথমদিকে উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। কিন্তু ভীত উপাচার্য তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হতে চাননি। উল্টো তারিখ পাল্টানোর সঙ্গে তিনি তাল মিলিয়ে মিথ্যাচার করেছেন। উপাচার্য পদে থেকে এ ধরনের নির্লজ্জ মিথ্যাচার করার পর ফারজানা ইসলাম শুধু উপাচার্য পদেই নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে থাকার যোগ্যতাও রাখেন না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রশ্নালয়ে পরিণত না হয়ে দুর্নীতিগারে পরিণত হয়েছে। গতকাল উপাচার্য যে গণ-অভ্যুত্থানের কথা বলেছেন তা মূলত গণপশুত্বের অভ্যুত্থান। উপাচার্যের অভ্যুত্থানের সংজ্ঞা দেখে তাঁর জ্ঞানের দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পেয়েছে। আমরা গোপালগঞ্জ, পাবনা ও বুয়েটের পরে জাহাঙ্গীরনগরে দেখলাম ক্ষমতাসীনরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কিভাবে পশুত্বালয়ে পরিণত করেছে। আমরা সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই পশুত্ব, স্বৈরাচারী আচরণ চিরতরে বিদায় করতে চাই।’

সংহতি সমাবেশে আন্দোলনের মুখপাত্র অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, ‘উপাচার্য নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু এই নিরাপত্তাহীনতা কে তৈরি করেছে? প্রশাসন করেছে। দুর্নীতিবাজ উপাচার্য ফারজানা করেছেন। তাঁকে এই ক্যাম্পাসে কোনোভাবেই রাখা যাবে না। তাঁকে অপসারিত হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প চলছে সেই মহাপ্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য হলেও তাঁকে সরে যেতে হবে।’

কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক অনিক রায় সংহতি জানিয়ে বলেন, ‘আপনাদের দাবি নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন চলছে। এই দাবি এখন সারা বাংলার ছাত্রসমাজের। আপনার (ভিসির) গণ-অভ্যুত্থানের বক্তব্যের পর সারা দেশে আপনার বিরুদ্ধে গণছাত্র-অভ্যুত্থান হয়েছে।’

আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক তপন কুমার সাহা, অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা, অধ্যাপক কামরুল আহসান, অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ ভুঁইয়া, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, অধ্যাপক খবির উদ্দিন, অধ্যাপক কবিরুল বাশার, অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি প্রমুখ।

জাবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক বডি সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত হয়েছে হল ছাড়ার ও ক্যাম্পাস বন্ধের। এখন কেউ এ নির্দেশ না মেনে হলে থাকলে ও মিছিল-সমাবেশ করলে তা তো অবৈধ ও আইনের লঙ্ঘন। তার পরও তারা যেহেতু আমাদের শিক্ষার্থী তাই আমি তাদের সবাইকে আহ্বান করব আইন মেনে চলতে।’

বিকেল সাড়ে ৪টায় সংহতি সমাবেশ শেষে আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপাচার্য বাসভবনসংলগ্ন সড়কে গিয়ে অবস্থান নিয়ে সেখানে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। দুই শতাধিক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে সেখানে যোগ দিয়েছেন প্রায় ৩০ জন শিক্ষক। উপাচার্যের বাসভবনকে ঘিরে থাকা দেড় শতাধিক পুলিশের মুখোমুখি অবস্থান করছিলেন তাঁরা। পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য পুলিশ সদস্যরা প্রস্তুত রয়েছেন।’

হল বন্ধ ঘোষণা করার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো অভিযান চালানো হবে কি না—এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে আমরা যেকোনো ধরনের সহায়তা করব।’

গতকাল উপাচার্যের বাসভবনের অফিস কক্ষে হল প্রাধ্যক্ষ কমিটির জরুরি সভার পর হল প্রাধ্যক্ষ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক বশির আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরের সব দোকান বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া সাড়ে ৩টার মধ্যে সব আবাসিক হল খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পরও হলে অবস্থান করলে প্রশাসনিক যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

উল্লেখ্য, গত সোমবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে আন্দোলনকারী শিক্ষকরা উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে তাঁর বাসভবন অবরোধ করে রাখেন। পরদিন মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ব্যানারবাহী একটি মিছিল সেখানে আসে। ওই মিছিলে দুই শতাধিক নেতাকর্মী ছিলেন। মিছিল থেকে উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করা হয়। হামলায় শিক্ষক, সাংবাদিকসহ অন্তত ৩৫ জন আহত হন। হামলার ঘটনার পর এক জরুরি সিন্ডিকেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

Design & Developed by: Ifad Technology