ঢাকা, বুধবার, ২১শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
৭০০ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা

৬ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি

ব্যাংকবহির্ভূত ৬টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে মেয়াদি ঋণ নিয়ে তারা পরিশোধ করতে পারছে না।

প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এবং প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট। এসব প্রতিষ্ঠানকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) প্রতিবেদন দিয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো।

প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হলে তাদের পক্ষে আর নতুন ঋণ পাওয়া সম্ভব নয়। আইনের কারণে আলোচ্য প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন করে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে পারছে না।

একই সঙ্গে কল মানি মার্কেট থেকেও ঋণ নিতে পারছে না। তবে গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত নেয়ার ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ নেই। কিন্তু এদের আর্থিক দুর্বলতার তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় আমানতকারীরা এখন আর টাকা রাখছে না। বরং জমা টাকা তুলে নিতে চাচ্ছে। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো আমানতকারীদের টাকা পরিশোধ করতে পারছে না।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে ২২টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের ১৭০ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের ১৮৫ কোটি, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির (বিআইএফসি) ২১৯ কোটি, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ৫০ কোটি, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ৩৮ কোটি এবং প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ২০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ী খেলাপি হওয়ার কথা; কিন্তু এখন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজেরাই খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। এটি আর্থিক খাতের জন্য বড় দুঃসংবাদ। এ অবস্থায় আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট বাড়বে। তিনি বলেন, যে কোনোভাবেই হোক, আর্থিক খাতের কোনো প্রতিষ্ঠানকে খেলাপি হতে দেয়া যাবে না। সে লক্ষ্যে আইনের প্রয়োগ করতে হবে।

সূত্র জানায়, খেলাপি হওয়ার পর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ঋণের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়িয়েছে। তারপরও তারা ঋণ শোধ করতে পারছিল না।

এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নালিশ করেছে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবে টাকা থাকলে তা থেকে যেন কেটে দেনা শোধ করে দেয়া হয়, এমন প্রস্তাবও এসেছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবেও তাদের পর্যাপ্ত অর্থ নেই। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকও কিছু করতে পারেনি। তাদের নির্দেশেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দিয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, অর্থ সংকটে পড়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আগের ব্যাংকের দেনা শোধ করতে পারছে না। দেনা সমন্বয় করতে নানামুখী চাপ দেয়া হলেও কোনো কাজে আসেনি। এখন তারা খেলাপি হয়ে পড়েছে।

এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ৩০ কোটি টাকার একটি এফডিআর বন্ধক রেখে প্রাইম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩০ কোটি টাকা করে ৬০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল।

ঋণের মেয়াদপূর্তির পর শোধ করতে ব্যর্থ হলে এফডিআরটি নিয়ে দুই ব্যাংকের টানাটানি শুরু হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়। এফএএস ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রশিত কুমার সরকার বলেন, দায়-দেনা সমন্বয় করে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘুরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি। আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। কিছু ঋণ শোধ করা হয়েছে। আশা করি, দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারব।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তহবিলের বড় অংশই আসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে মেয়াদি আমানত ও কল মানি মার্কেট থেকে ধার নিয়ে চলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এর বাইরে রয়েছে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত।

ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণ ও গ্রাহকদের আমানত পরিশোধে ব্যর্থতার দায়ে ইতোমধ্যে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসকে অবসায়ন করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় এটিকে অবসায়ন না করে পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানিকেও (বিআইএফসি) অবসায়ন করার অনুমতি চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না পাওয়ায় অবসায়নের উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হয়নি। দেশে নন ব্যাংকিং ৩৬টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সারা দেশে এগুলোর শাখা আছে ৭৭০টি।