ঢাকা, রবিবার, ২৯শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বাস পোড়ানো ইস্যুতে চাপে বিএনপি

করোনার মধ্যে রাজধানীতে হঠাৎ সিরিজ বাস পোড়ানোর ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গন কিছুটা উত্তপ্ত। এ ঘটনার পেছনে কে বা কারা আছে তা এখনও স্পষ্ট হয়নি। এ নিয়ে চলছে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। তবে এ ইস্যুতে দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা এবং গ্রেফতারের কারণে নতুনভাবে চাপে পড়েছে বিএনপি। সক্রিয় নেতাদের গ্রেফতার করা হলে দল পুনর্গঠনসহ মাঠের রাজনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার শঙ্কা আছে। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় দলের নীতিনির্ধারকরাও বেশ চিন্তিত। পুরো বিষয়টি তারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। আপাতত নেতাকর্মীদের গ্রেফতার এড়িয়ে সতর্কভাবে চলাফেরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ১২ নভেম্বর দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজধানীতে ১২টি বাসে আগুন দেয়া হয়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। এ ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ১৬টি মামলা হয়েছে। এতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতাদের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত পাঁচ শতাধিক আসামি করা হয়েছে।

এদিকে বাস পোড়ানোর ঘটনায় মামলার পর থেকে নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে গ্রেফতার আতঙ্ক। আটকের আশঙ্কায় বেশির ভাগ সক্রিয় নেতা রয়েছেন আত্মগোপনে। গত দু’দিনের দলীয় কোনো কর্মসূচিতে তাদের দেখা যায়নি। শনিবার নির্বাচনে কারচুপি ও মামলার প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ করে বিএনপি। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত ওই প্রতিবাদ সভায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া সিনিয়র কোনো নেতা দেখা যায়নি। এছাড়া যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারাও ছিলেন অনুপস্থিত। গ্রেফতার এড়াতে রাতেও অনেকে নিজ বাসায় থাকছেন না। দিনের বেলায়ও প্রকাশ্যে তাদের কোনো কর্মতৎপরতা চোখে পড়ছে না। যেসব নেতার নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে তারা উচ্চ আদালতে জামিনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দলীয় আইনজীবীদের এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে শত শত অজ্ঞাত আসামি করা নিয়েই বেশি চিন্তিত দলটির নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, মামলায় নাম উল্লেখ করা হলে আদালত থেকে আগাম জামিন নেয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অজ্ঞাত আসামি হলে সেই সুযোগ নেই। এখানে যে কাউকে আটক করে ওই মামলায় গ্রেফতার দেখানোর সুযোগ রয়েছে। তাই অজ্ঞাত মানে সবাই আসামি। এসব মামলায় চার্জশিট দেয়ার আগ পর্যন্ত যে কোনো নেতা গ্রেফতার হতে পারেন- এমন শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। তাই চার্জশিট হওয়ার আগ পর্যন্ত সবাইকে সতর্কভাবে চলতে হবে। এমনকি দলীয় কর্মসূচি দেয়ার ক্ষেত্রেও ভাবতে হবে দলটির হাইকমান্ডকে। কঠোর কর্মসূচি দেয়া হলে সরকার এসব মামলায় সক্রিয় নেতাদের আটক করতে পারে। সবমিলিয়ে আপাতত বিএনপি কিছুটা চাপে পড়বে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সূত্র জানায়, বাস পোড়ানোর ঘটনা নিয়ে দলটির ভেতরেও চলছে নানা আলোচনা। বেশির ভাগ নেতাকর্মীর প্রশ্ন কারা, কেন হঠাৎ করে এমন ঘটনা ঘটাল। এ নিয়ে দলের নীতিনির্ধারকরাও অন্ধকারে। তারা বাস পোড়ানো ও পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করছেন। সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এ ঘটনার পেছনে বিএনপির হাত রয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে তারা কোনো তথ্য-প্রমাণ দিতে পারছে না। তাই জনগণ যাতে ক্ষমতাসীন দলের এমন অভিযোগকে বিশ্বাস না করে সে ব্যাপারে বিএনপিকে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন নেতাকর্মীরা।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, আমরা যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি তখনই আমাদের চাপে রাখতে সরকার নানা অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। অতীতে গায়েবি মামলা দিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। ২০১৮ সালে একদলীয় নির্বাচনের পর বিএনপি পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। করোনার কারণে আমাদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড কিছুটা স্থবির ছিল। পুনরায় আমরা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড শুরু করেছি। সারা দেশে আমাদের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত। এমন পরিস্থিতিতে সরকার আবার ফাঁদ পাতার পুরনো খেলা শুরু করেছে। তারা চায় না বিএনপি ঘুরে দাঁড়াক। তাই বিএনপিকে কোণঠাসা করতে সরকার তাদের এজেন্টদের দিয়ে হঠাৎ করে এসব নাশকতামূলক কাজ করিয়ে এখন বিএনপির ওপর দোষ চাপাচ্ছে। কেউ যাতে এ ফাঁদে পা না দেয় সেই ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, বাস পোড়ানোর ঘটনা কারা ঘটিয়েছে তা আমরা জানি না। কিন্তু এ ঘটনার পর বিএনপি চাপে পড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ ইতোমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, অনেকে গ্রেফতার হয়েছেন।

তিনি বলেন, এ ঘটনা নিয়ে অতীতের মতোই চলছে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। কিন্তু প্রশ্ন হল হঠাৎ কেন বিনা মেঘে বজ পাত। কারা, কেন এমনটা ঘটাল তা খুঁজে বের করতে হবে। এতগুলো বাস পোড়ানো হল অথচ হাতেনাতে কেউ ধরা পড়ল না। পরিস্থিতি দেখে মনে হয় না এটা কোনো সাধারণ দুর্বৃত্তদের কাজ। কারণ এতে তাদের লাভবান হওয়ার কিছু নেই। নাশকতামূলক ঘটনাটি রাজনৈতিক বলেই মনে হচ্ছে। তাই দোষারোপের রাজনীতি না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।