ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

পাঁচ কেজি চালের জন্য রাত জেগে অপেক্ষা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়কের পাশেই আরামবাগ মোড়। রাত ১১টা। অনেকটাই ফাঁকা হয়ে এসেছে সড়ক। মাঝে মধ্যে সোনামসজিদ স্থলবন্দর থেকে ছেড়ে আসা ট্রাকগুলো যেন রাতের নীরবতা ভাঙছে। শীতের কারণে মূলসড়কে মানুষ না থাকলেও গলির এ মোড়ে অন্তত ৩০ জনের মতো নারী বসে আছেন সারিবদ্ধভাবে। কেউ ইটের ওপর, কেউ বাড়ি থেকে আনা চট, কেউবা বসেছেন মোড়া বা ছোট টুলে। শীতের মধ্যে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা মানুষগুলো এ অপেক্ষা ওএমএসের পাঁচ কেজি চালের জন্য। সকাল ৯টায় শুরু হবে ডিলার পয়েন্টে চাল-আটা বিক্রি, সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন তারা। শুধু আরামবাগ নয়, শহরের বিশ্বরোড মোড়েও ওএমএসের চালের জন্য একই ভাবে অনেককে রাত জেগে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। রাত যত বাড়ে, শীতের তীব্রতাও বাড়ে, সেই সঙ্গে বাড়ে চাল কিনতে আসা মানুষের সংখ্যা।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১৯ জন ডিলার মাধ্যমে ওএমএসের চাল ও আটা বিক্রি করা হচ্ছে। সপ্তাহে দুই দিন প্রতিটি ডিলার পয়েন্টে চাল ৩০ টাকা কেজি দরে পাঁচ কেজি ও ২৪ টাকা কেজি দরে পাঁচ কেজি করে আটা জনপ্রতি বিক্রি করা হয়। পয়েন্টগুলোতে খুব সকাল থেকে অপেক্ষায় থাকে মানুষ, কোনো কোনো পয়েন্টে আগের দিন রাত থেকেও অপেক্ষমান থাকেন অনেকে।

গত বুধবার আরামবাগ এলাকায় ওএমএসের দোকানের পাশে অপেক্ষামান শেলী বেগম জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে অপেক্ষা করেও বুধবার চাল পাননি। বৃহস্পতিবারে যাতে চান পান, সে জন্য বুধবার সন্ধ্যা থেকে আবারও অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন ‘বাড়িতে প্রতি দিন দেড় কেজি চ্যাল লাগে, এক কেজি আটা লাগে। বাড়িতে সাতটা খানাআলা (সদস্য), যদি চ্যাল না পায়, তাহলে সে মানুষগুলা কি খ্যায়? সপ্তাহে সপ্তাহে অ্যাসা ঘুরা চল্যা যাতে হচ্ছে। তাহলে কীভাবে হামরা চলব? সারা র্যাত হামরা অ্যাসা বসা আছি। কাল সন্ধ্যার সমাও (সময়) অ্যাসাও ঘুর্যা গেছি। আজ আবার অ্যানু।’ চালের জন্য অপেক্ষা করছিলেন শাকেরা বেগম নামে আরেক নারী। তিনি বলেন, গত বছরও তিনি লাইনে চাল কিনতে আসেননি। এখন চালের দাম এতো বেড়ে গেছে যে বাধ্য হয়েই তাকে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে।

আরামবাগ এলাকার ডিলার নুরুল ইসলাম বলেন, ‘শীতের রাত তবুও মানুষ কষ্ট করে অপেক্ষা করে। কিন্তু আমার যে বরাদ্দ, তাতে সবাইকে দিতে পারি না। ম্যালা মানুষই ঘুর্যা যায়। যদি বরাদ্দটা বাড়ে, তাহলে লাইনে এত ঝামেলা হবে না, সবাই পাবে।’ বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি ইসরাইল সেন্টু বলেন, যেটা দিচ্ছে সেটা যথেষ্ট পরিমাণ নয়। প্রত্যেকে যাতে পায়, সেই লক্ষ্যে ব্যবস্থাপনাটা পরিবর্তন প্রয়োজন। জনগণের দুঃখ কষ্ট লাঘবের এ পদ্ধতিটা পালটিয়ে রেশনিং চালু করা উচিত। একই মতামত দেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনিরও।

এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক এ কে এম গালিভ খান বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের খাদ্যদব্যপ্রাপ্তি সহজিকরণের জন্য সরকারের অনেকগুলো জনবান্ধব কর্মসূচি রয়েছে। টিসিবি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ওএমএস, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, অনগ্রসর জনগোষ্টির জন্য আর্থিক সহায়তা, শিক্ষা উপবৃত্তি, এছাড়াও জিআর, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল ছাড়াও অনেক সাহায্য সহযোগিতা সরকার জনগণকে করে থাকে। এ সব কর্মসূচির মাধ্যমে জেলার প্রায় ১৪ লাখের কাছে কোনো না কোনো সরকারি সহায়তা সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে। আমরা সবকিছুই সুশৃঙ্খলভাবে করার চেষ্টা করছি।’ ওএমএসের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আরো সুন্দরভাবে করার জন্য আমি পদক্ষেপ নেব।’