ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ফের বাড়ছে গ্যাস বিদ্যুতের দাম!

ফের গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে? গ্রাহকদের মনে এ রকম একটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এখতিয়ার ক্ষুণ্ণ করে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম সরাসরি নির্ধারণের ক্ষমতা নিজের হাতে নিতে যাচ্ছে সরকার। এ জন্য বিইআরসি আইনের সংশোধন মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে সংশোধনী কার্যকর করা হবে বলে সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সূত্রমতে, আইএমএফের শর্ত বা পরামর্শ অনুযায়ী স্বল্প সময়ের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। সে জন্য আইন সংশোধনে তাড়াহুড়ো করছে সরকার। সংসদে এ আইন পাস করতে হলে কিছুটা সময় বেশি লাগবে। এ জন্য রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এটি কার্যকর করতে চায় সরকার। সূত্র বলছে, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে বহু কাঙ্ক্ষিত আইএমএফের প্রথম কিস্তির ঋণের অর্থ পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ। এর আগে আইএমএফের বোর্ড সভায় এ ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন হতে হবে। তার আগেই আইএমএফের শর্ত বা করণীয় পালনের অংশ হিসেবে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কমিশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে অনেকটা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম-অপচয়গুলো চিহ্নিত করা যেত। নির্বাহী আদেশে দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ সবকিছু মানা হবে না। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে পারে। তাদের মতে, বিভিন্ন বিষয়ে শুনানি ও প্রশ্নের সম্মখীন হতে হয় বলে বিইআরসির ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে মন্ত্রণালয়ের হাতে ন্যস্ত করা হচ্ছে। কারণ সরকার চাইলে বিধি সংশোধন করে বিশেষ বিইআরসির মাধ্যমেই কম সময়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম সমন্বয় করতে পারত। আইন সংশোধন করে ক্ষমতা খর্বের প্রয়োজন ছিল না।

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, বিইআরসির মাধ্যমে দাম সমন্বয় করতে কমপক্ষে তিন মাস সময় লাগে। কমিশন যেসব কাগজপত্র চায়, তা তৈরি ও অডিট করতেও সময় যায়। কিন্তু বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য দ্রুত ওঠানামা করে। বিশেষ সময়ে চাইলেও দ্রুত দাম সমন্বয় করা যায় না। তাই আইনে সংশোধনী এনে কিছু ক্ষমতা সরকার তার হাতে রাখল।

গত সোমবারের মন্ত্রিসভা কমিটিতে উত্থাপিত আইন সংশোধনের সারসংক্ষেপে জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমানে সংসদ অধিবেশন নেই, কিন্তু আশু ব্যবস্থা গ্রহণে বিশেষ পরিস্থিতি বিদ্যমান। সেহেতু বর্তমান আইনে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের মূল্য সমন্বয়ে সরকারের ক্ষমতা সংরক্ষণ সংক্রান্ত বিধান সংযোজনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করা যেতে পারে।

সূত্র বলছে, বর্তমান জাতীয় সংসদের ২০তম অধিবেশন শেষ হয়েছে ৬ নভেম্বর। ২১তম অধিবেশন শুরু হতে পারে জানুয়ারির মাসের প্রথমদিকে। ফলে মন্ত্রিসভা অনুমোদিত বিইআরসি আইনের সংশোধন আগামী সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করতে জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এর পর তা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে যাবে। সব মিলিয়ে একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে অনেকটা সময় লাগবে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে শিগগিরই আইনে সংশোধনী আনা যায়। এর অর্থ হলো, দ্রুততম সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত জুন মাসে ভোক্তা পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ঘনমিটারে ৯ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বাড়িয়ে ১১ টাকা ৯১ পয়সা করে বিইআরসি। গত ২১ নভেম্বর বিদ্যুতের পাইকারি দাম প্রতি ইউনিটে (কিলোওয়াট পার আওয়ার) ৫ টাকা ১৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ২০ পয়সা নির্ধারণ করে কমিশন। বর্তমানে বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্রাহক পর্যায়ে ২০ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। গত ৫ আগস্ট লিটারে ৩৪ থেকে ৪৬ টাকা পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। ২৯ আগস্ট প্রতি লিটারে ৫ টাকা দাম কমানো হয়।

পেট্রোবাংলার দাবি, এখনও তারা লোকসানে গ্যাস বিক্রি করছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, অকটেন বাদে অন্য তেল বিক্রিতে লোকসান হচ্ছে এখনও; যদিও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অনেক কমে এসেছে। অপরিশোধিত প্রতি ব্যারেল তেল এখন বিশ্ববাজারে ৭৫ থেকে ৮০ ডলার।

মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয় সরকারকে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও গ্রাহক পর্যায়ে ভর্তুকি মূল্যে তা সরবরাহ করা হয়। সম্প্রতি আইএমএফের ঋণ নিতে গিয়ে ভর্তুকির বিষয়টি ফের আলোচনায় আসে। আইএমএফ চাইছে, সরকার ভর্তুকি থেকে বেরিয়ে আসুক। খরচ কমাতে সরকারও ভর্তুকি কমিয়ে আনতে চায়। সম্প্রতি আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করার পরই বাজারদর অনুসারে বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম নির্ধারণ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে সরকারের ওপরমহল থেকে সংশ্নিষ্টদের বলা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিইআরসি আইন সংশোধন করা হলো বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা। ফেব্রুয়ারিতে আইএমএফের ঋণের প্রথম কিস্তির অর্থ পাওয়ার আগেই এক দফা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা। তবে কেউ কেউ বলছেন, আগামী বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মূল্যস্ম্ফীতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীন। সীমিত আয়ের মানুষ অনেক কষ্টে আছে। এ রকম একটি সময়ে বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানো কতটা যৌক্তিক- তা নিয়েও সরকারের মধ্যে মত-দ্বিমত আছে। তবে আইএমএফের ঋণ পেতে সরকারকে হয়তো এই অপ্রীতিকর কাজটি দ্রুতই করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মাহবুব হোসেন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ম. তামিম সমকালকে বলেন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রস্তাবনা অনুসারেই বিইআরসি গঠন করা হয়েছিল। সংস্থাগুলো ১৯৯৬ সাল থেকে এ বিষয়ে চাপ দিয়ে আসছিল। পরে ২০০৭ সালে কমিশন কার্যকর হয়। গত এক যুগের বেশি সময় ধরে বিইআরসি চমৎকার কাজ করে যাচ্ছে। গ্রাহক, ভোক্তাদের কথা বলার জায়গা ছিল। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবদিহির আওতায় এসেছিল অনেকটা। এখন সে আইন খর্ব করলে ভোক্তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। গ্যাস-বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আরও কমবে।

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কমিশন কমানো, বিভিন্ন আয়-ব্যয় বিষয়ে প্রশ্ন তুলে কমিশন আমলাদের চক্ষুশূল হয়েছে। তাই আইএমএফের শর্তের সুযোগে বিইআরসিকে ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে দেওয়া হলো। এখন আমলারা যা চাইবেন, তা-ই হবে। ইচ্ছামতো যখন তখন নিত্যপণ্যের দাম বাড়াবে। জনগণের পকেট কাটা হবে।