ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আমনে কৃষকের মুখে হাসি

অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর দেশে বৃষ্টিপাত কম হওয়া সত্ত্বেও আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ধানের বাজারদরও ভালো। কাঙ্ক্ষিত দরে উৎপাদিত ফসল বিক্রয় করতে পেরে কৃষকরাও বেজায় খুশি। যদিও তারা উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে বলে দাবি করছেন। ইতোমধ্যে আমন সংগ্রহ শুরু হয়ে গেছে। তারা ফসল সংগ্রহে মাঠে আর কৃষানিরা ঘরে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

সাইক্লোন সিত্রাং অধিকাংশ জেলার আমন আবাদের জন্য আশীর্বাদ হলেও উপকূলীয় জেলা-উপজেলাগুলোতে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। কারণ সিত্রাংয়ের কারণে গতবারের তুলনায় এবার উপকূলীয় জেলা-উপজেলায় ফলন কম হয়েছে। ধান বেরোনোর সময় সাইক্লোন সিত্রাংয়ে ফসল বিনষ্ট হয়েছে।

জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রবীন্দ্রশ্রী বড়ুয়া যুগান্তরকে বলেন, এ বছর আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রথমদিকে বৃষ্টিপাত কম থাকলেও ঠিক সময় পরিমাণমতো বৃষ্টি হয়েছে। ফসল কাটার সময়ের পরিবেশটাও ভালো।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফিল্ড সার্ভিসের অতিরিক্ত পরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, এ বছর আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। আবহাওয়া ভালো ছিল। ধান সংগ্রহে কৃষককে কোনো সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না। ধানের দামও বেশ ভালো। আশা করি কৃষক উপকৃত হবে। ধানের দাম প্রথম দিকের চেয়ে একটু কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন ধান উঠলেই দাম একটু বেশি থাকে। তবে এখনো এক হাজার ২০০ টাকার নিচে কোনো ধান বিক্রি হচ্ছে না।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চলতি বছর দেশে ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও উৎপাদন হয়েছে ৫৯ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ প্রায় ৫৬ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে আমন চাষাবাদ করা হয়েছ। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৬৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬০০ টন। ইতোমধ্যে ২৮ লাখ ৯৫ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির ফসল কাটা হয়েছে। ফসল কাটার হার ৪৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ। গতকাল (৩০ নভেম্বর) পর্যন্ত ৯০ লাখ ৩১ হাজার ২০০ টন ধান আহরণ করা হয়েছে। এ বছর গড় ফলন প্রতি হেক্টরে ৩ দশমিক ১১৯ টন।

ময়মনসিংহের ত্রিশালে ২৪ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমির মধ্যে ১৯ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করা হয়েছে। তার মধ্যে হাইব্রিড জাত চাষ হয়েছে ৯৫০ হেক্টর, উফশী জাত চাষ ১৭ হাজার ৪৭০ হেক্টর এবং দেশি তথা স্থানীয় জাতে ৮১০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করা হয়েছে। হাইব্রিড জাতে হেক্টরপ্রতি ৩ দশমিক ৬, উফশী ২ দশমিক ৮৫ এবং স্থানীয় জাতে ১ দশমিক ৬০ টন নির্ধারণ করা হয়েছে।

গত বছর উপজেলার ১৯ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে আমন উৎপাদন হয়েছে ৫৫ হাজার ৪৫৫ দশমিক ৮৮ টন। এ বছর ইতোমধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশ জমির ফসল কেটেছে কৃষক। ভালো দামে ধান বিক্রয় করতে পারায় কৃষক বেশ আনন্দিত। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া রহমান জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার উপজেলায় আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ছাড়িয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

কিশোরগঞ্জে আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলার ১৩টি উপজেলার ৮২ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। গত বছরের চেয়ে এবার জেলায় ৯০০ হেক্টরের বেশি জমিতে আমন ধান চাষ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৮৪১ চাল উৎপাদনের লক্ষামাত্রা অর্জিত হয়েছে। কৃষি উপকরণ সার ও কীটনাশকের মূল্য বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেশি হয়েছে বলে দাবি করেছেন কৃষকরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণের উপ-পরিচালক মো. আব্দুস সাত্তার জানান, প্রথমদিকে বৃষ্টি না হলেও মৌসুমের ঠিক সময়ে পরিমিত বৃষ্টির ফলে ফলন ভালো হয়েছে।

দিনাজপুরে এ বছর জেলার ২ লাখ ৬০ হাজার ৮৩২ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করা হয়। জেলায় আমন আবাদ বেড়েছে। গত বছর জেলায় ২ লাখ ৬০ হাজার ৮২৫ হেক্টর জমিতে আমান আবাদ হলেও এবার হয়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার ৮২৫ হেক্টরে। এ বছর প্রতি মন ধান বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকা। বিআর-৪৯ জাতের প্রতি মন ধান ১ হাজার ৩৭৫ টাকা, জিরা-৯০ জাতের প্রতি মন ধান ২ হাজার ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর জেলায় প্রায় ৭ লাখ ৭৭ হাজার টন চাল উৎপাদন করা হয়েছে।

নেত্রকোনায় আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৮০০ হেক্টর। কিন্তু চাষাবাদ করা হয়েছে ১০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। ফলনও ভালো হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ৫ টন। ধানের দামও ভালো তাই কৃষক বেজায় খুশি। ইতোমধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ আমন সংগ্রহ শেষ হয়েছে। প্রতি মন আমন ধান ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নুরুজ্জামান জানান, আমন চাষে সার ও ওষুধ দিতে পারেনি কৃষক। কিছুটা খরাও ছিল। তারপরও বাম্পার ফলন হয়েছে। উপ-পরিচালক আরও বলেন, আশা করছি লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ফসল হবে।

রাজশাহী জেলার ৭৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে আবাদ হয়েছে ৭৭ হাজার ৫৭০ হেক্টরে। প্রায় ১ হাজার ৭০ হেক্টর বেশি জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। বিঘাপ্রতি ১৭ থেকে ১৮ মন ফলন হয়েছে। প্রতি মন ধান ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোজার হোসেন জানান, রাজশাহীর অধিকাংশ চাষির ধান কাটা শেষ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তারা ফসল কেটে গোলাজাত করতে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি।

বগুড়া জেলায় প্রতি বিঘায় গত বছরের তুলনায় ২-৩ মন ধান বেশি উৎপাদন হয়েছে। ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৫০ হেক্টরে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭৫ হেক্টরে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫২৫ হেক্টরের বেশি জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৫১ হাজার ৮১৩ টন। যা গত মৌসুমের চেয়েও ৫৬ হাজার ১৩১ টন বেশি।

কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান জানান, বগুড়ায় আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রতি মন ধান ১৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষক গড়ে প্রতি মন ধানে ১০০ টাকা করে লাভ পাবেন। জেলার কৃষকরা জানান, হঠাৎ করে ধানের দাম কমতে শুরু করেছে। ধানের দাম কমায় তারা শঙ্কিত।

কুষ্টিয়া জেলায় আমনের ফলন ভালো হয়েছে। ভালো দামে ধান বিক্রয় করছে কৃষক। জেলায় চলতি মৌসুমে ৮৮ হাজার ৯১৯ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৪ হেক্টর বেশি। জেলায় মোট ৩ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়েছে। ১৩০০ টাকা দরে প্রতি মন ধান বিক্রি হচ্ছে। তবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় কৃষকের খুব একটা লাভ হবে না। তবে লোকসানও হবে না। অর্থাৎ সামান্য লাভ হবে।

নওগাঁয় এ বছর জেলার ১১ উপজেলায় ১ লাখ ৯৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। ফলন বিঘাপ্রতি ২২-২৫ মন। ধান কাটার শুরুতে প্রতি মন ধান ১৪০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন কিছুটা কমে গেছে। এখন প্রতিমন ধান ১২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। জেলায় চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৬ লাখ ২২ হাজার টন।

নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলায় আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। উপজেলার ১৪ হাজার ৮৭০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। জেলার কৃষকরা জানান, প্রতি মন ধান তারা ১ হাজার ১৭০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। এতে তারা সন্তুষ্ট বলে জানান।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলম জানান, চলতি বছর ১৪ হাজার ৮৭০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আবহওয়া অনুকূলে থাকা, সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়া, পোকামাকড়ের উপদ্রব না থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। বাজারদরও ভালো। কৃষকরা উপকৃত হচ্ছেন।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন রাজশাহী ব্যুরোর তানজিমুল হক, কিশোরগঞ্জ ব্যুরোর এটিএম নিজাম, বগুড়া ব্যুরোর নাজমুল হুদা নাসিম, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি এএম জুবায়েদ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি মো. আবু সাঈদ, ময়মনসিংহের ত্রিশাল প্রতিনিধি খোরশিদুল আলম মজিব, নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি মো. আব্দুর রাজ্জাক, দিনাজপুর প্রতিনিধি একরাম তালুকদার ও নেত্রকোনা প্রতিনিধি তোফাজ্জল হোসেন।