ঢাকা, বুধবার, ২৫শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রে সর্বত্রই বাড়ছে নির্বাচনোত্তর সহিংসতা

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটগ্রহণের প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে হিংসা ছড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। স্থানীয় সময় রবিবার সকালে ওয়াশিংটন ডিসির বেশ কিছু এলাকায় হাতাহাতি, ছুরিকাঘাত, ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। মুলত ট্রাম্প সমর্থকরাই পথে নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। সেই থেকে ছড়াচ্ছে হিংসার আগুন। ইতিমধ্যে ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পতাকা বহনকারী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে প্রাউড বয়েসসহ দেশটির উগ্র ডানপন্থি দলের সদস্যদের দেখা গেছে, যাদের অনেকে হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ আচ্ছাদন পরিহিত ছিল।

গত ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন ভোটে জয়ী হয়েছেন তা নিশ্চিত হয়ে যায় এর এক সপ্তাহ পরেই। কিন্তু এখনও পরাজয় স্বীকার করেননি বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বরং নির্বাচনে ব্যাপক ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছেন তিনি। যদিও এ বিষয়ে এখনও কোনও তথ্য-প্রমাণ দেখাতে পারেনি রিপাবলিকান শিবির।

অপরদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নির্বাচনের ফলাফল অর্থাৎ পরাজয় মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ওবামা বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এখন পরাজয় মেনে নেওয়ার সময় এসেছে। জো বাইডেনের জয় মেনে নিয়ে তাকে হার মেনে নিতে হবে। নির্বাচনের ফলাফল উল্টে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলেও এ সময় উল্লেখ করেন তিনি।

এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৫৩৮টি ইলেক্টোরাল ভোটের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ‘ম্যাজিক ফিগার’ ২৭০ আগেই ছুঁয়ে ফেলায় জো বাইডেনের জয় আগে থেকেই নিশ্চিত ছিল। মার্কিন গণমাধ্যমগুলোও তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করেছে।

 

 

তবে প্রথম থেকেই পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন ট্রাম্প। তিনি বারবার ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছেন। যদিও নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফেডারেল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তার এই দাবি মিথ্যা। ভোট জালিয়াতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বড় ব্যবধানে ট্রাম্পের কাছে হেরে গেলেও তা মানতে নারাজ ট্রাম্প। তার অভিযোগ, নির্বাচনে জালিয়াতি করে জয়ী হয়েছেন জো বাইডেন।

২০১৬ সালে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই ‘শেতাঙ্গ আধিপত্য’ ও ‘বর্ণবিদ্বেষ’ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে দেশটিতে। করোনাকালে শেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তার হাতে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার পর আন্দোলন শুরু হয়। এক পর্যায়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নিলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে।

এদিকে প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের পর জর্জিয়া, নেভাডা ও পেনসিলভানিয়ার মতো রাজ্যগুলোয় রাস্তায় নেমে পড়ে হাজার হাজার ট্রাম্প সমর্থক। পরাজয় না মেনে নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে মার্কিন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন ট্রাম্প। উগ্র সমর্থকদের প্ররোচনা দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য ট্রাম্পকেই দায়ি করছেন বিশ্লেষকরা।

এখনও নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে অনড় রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। শনিবার ট্রাম্পের সমর্থনে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ রাজধানী ওয়াশিংটনসহ বিভিন্ন প্রদেশে মিছিল বের করে। হোয়াইট হাউসের দিকে মিছিল এগোনোর সময় ট্রাম্পবিরোধীদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে তারা। এরপরেই শুরু হয় হাতাহাতি। একে অপরকে লক্ষ করে ইট-পাটকেল ছোড়ার পাশাপাশি লাঠিচার্জ করা হয় বলেও অভিযোগ আছে।

এদিকে শুক্রবার আমেরিকায় নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন। নির্বাচনের ফল পাওয়ার প্রায় ১০ দিন পর বেজিংয়ের অভিনন্দন বার্তা স্পষ্ট ইঙ্গিত, হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের জন্য ফিরছেন না এটা তা মেনে নিয়েছে চীন। সবমিলিয়ে ট্রাম্প শিবিরের ফের ক্ষমতা দখলের আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। অভিযোগ আছে, শেষ আশা হিসেবে সহিংস বিক্ষোভকে বেছে নিয়েছেন ট্রাম্প।

শনিবার ভোট জালিয়াতি নিয়ে ট্রাম্পের দাবির স্বপক্ষে ওয়াশিংটন ডিসির রাস্তায় নেমে আসেন হাজার হাজার সমর্থক। এ সময় ‘ভোটচুরি বন্ধ করো’, ‘প্রত্যেকটি ভোট গণনা করো’ প্রভৃতি স্লোগান দেন তারা। অনেকের হাতেই ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগান তুলে বিক্ষোভ দেখান। তথ্যমতে, এদিন হোয়াইট হাউসের অদূরে ফ্রিডম প্লাজায় সমবেত হয়েছিলেন অন্তত ১০ হাজার ট্রাম্পভক্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে করোনাভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণ সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীদের বেশির ভাগের মুখেই মাস্ক দেখা যায়নি, ছিল না সামাজিক দূরত্বের বালাইও। পরে তারা মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল নিয়ে যান।

তবে রাত নামতেই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে বেশকিছু জয়গায় মারামারি ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের দৃশ্য দেখা গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, সংঘর্ষস্থল থেকে বেশ কয়েকটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হামলা ও অস্ত্র রাখাসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। সংঘর্ষের সময় অন্তত দুইজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। ইতিমধ্যে একজন ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছেন। বিরোধীদের অভিযোগ, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সমর্থকদের সহিংসতায় উস্কানি দিচ্ছেন। শনিবার বিক্ষোভ চলাকালে এর পাশ দিয়ে গাড়িবহর নিয়ে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সেখানে না দাঁড়িয়ে সোজা ভার্জিনিয়ায় নিজের গলফ ক্লাবে চলে যান ট্রাম্প। অবশ্য গাড়িতে বসেই জানালা দিয়ে হাসিমুখে সমর্থকদের উদ্দেশে হাত নেড়ে অভিবাদন জানিয়েছেন তিনি।