মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে সরকারের কাঁধে ৮১০ মামলার বোঝা

বৃহস্পতিবার, ০৬ জুন ২০১৯ | ৭:৫২ অপরাহ্ণ | 48 বার

মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে সরকারের কাঁধে ৮১০ মামলার বোঝা

মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে মামলায় জর্জরিত সরকার। মুক্তিযোদ্ধার বয়স, বাছাই-প্রক্রিয়ার নীতিমালা, তালিকা থেকে কর্তন বা তালিকায় অন্তর্ভুক্তি নিয়ে একের পর এক মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে। মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে ৮১০টি মামলা দায়ের হয়েছে। মামলার পর মামলার কারণে সরকার কয়েক দফা চেষ্টা করেও মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে পারেনি। বাধ্য হয়ে বারবার সময় নিতে হচ্ছে। স্বাধীনতা দিবস এলে বলা হচ্ছে বিজয় দিবসের আগে, আর বিজয় দিবস এলে বলা হচ্ছে স্বাধীনতা দিবসের আগে পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির পর তা প্রকাশ করা হবে। সবশেষে, গত স্বাধীনতা দিবসে তালিকা প্রকাশ করতে চেয়েও তা পারেনি সরকার।

জানা গেছে, গত ২৬ মে অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ওই সময় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তালিকা তৈরিতে বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে ৮১০টির মামলার কথা বলা হয়। অবশ্য এসব মামলার মধ্যে আদালতের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী শুনানির মাধ্যমে ৩৩টি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই, উপজেলা/মহানগর যাচাই-বাছাই কমিটি, সম্মানীভাতা, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্তকরণ, গেজেট বাতিল, নাম ও ঠিকানা সংশোধন, বিভিন্ন আবেদন নিষ্পত্তিকরণ, বিভিন্ন সমিতি সংক্রান্ত বিষয়ে এসব মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব ইস্যুতে নতুন নতুন মামলা বা রিট দায়ের হচ্ছে আদালতে। এসব মামলার কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগও বারবার ভেস্তে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীকে বারবার প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় মন্ত্রণালয় কোনও শক্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। ফলে মামলা নিষ্পত্তি করেই ধীরগতিতে এগুতে হচ্ছে।

সংসদীয় কমিটির সবশেষ বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, মামলার চাপ সামলাতে সরকার জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ কাউন্সিলের (জামুকা) একজন উপ-পরিচালককে ফোকালপয়েন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এছাড়া মামলায় সরকারি স্বার্থরক্ষায় জামুকার পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয় ও হাইকোর্টে যোগাযোগ এবং মামলার কার্যক্রম সমন্বয় করার জন্য একজন উপ-পরিচালক ও একজন সহকারী পরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী নিজেই আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন।

অবশ্য মুক্তিযোদ্ধাদের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে গত মার্চে উচ্চ আদালত একটি বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের মামলা শুনানির জন্য আলাদা বেঞ্চও গঠন করা হয়। আলাদা বেঞ্চ গঠনের কারণ উল্লেখ করে হাইকোর্ট ওই সময় বলেছিলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আদালতের বারান্দায় ঘোরাটা শোভনীয় নয়। ওই মাসে হাইকোর্টের ওই দ্বৈতবেঞ্চ মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত বেশ কিছু মামলার রায় দেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৯ মে পৃথক ১২টি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স বিষয়ে সরকারের গেজেট বাতিল করে রায় ঘোষণা দেয় উচ্চ আদালতের একটি দ্বৈতবেঞ্চ। এর আগে ১৬ মে বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ বলা যাবে না বলে রায়ও দেন।

মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি শাজাহান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা জেনেছি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ওপর অনেক মামলা দায়ের হয়েছে। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে আসলে স্বচ্ছ ও সুন্দরভাবে বিষয়টির নিষ্পত্তি কিছুটা কঠিন হয়ে পড়েছে। বস্তুত সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কারণে সনদের বিষয়ে আগ্রহ বেশি তৈরি হয়েছে। এ কারণে অতীতে অনেকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও সনদ নিতে আগ্রহী না হলেও এখন তারা আসছেন। এই সুযোগে কিছু অমুক্তিযোদ্ধাও ভুয়া দলিল দস্তাবেজ দাখিল করে সনদ নিতে যাচ্ছে। আর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেই মামলা ঠুকে দিচ্ছে।’

শাজাহান খান আরও বলেন, ‘আমরা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করে জাতিকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সঠিক তালিকা প্রকাশ করতে মন্ত্রণালয়কে বলেছি।’

জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। বারবার বলছি তালিকা প্রকাশ করবো। কিন্তু আদালতের নির্দেশনাসহ নানা কারণে পারছি না। তবে, আমাদের চেষ্টার কোনও ত্রুটি নেই।’

আদালতের কিছু কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন মন্তব্য করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ৪ বছর বয়সী শিশুকেও মুক্তিযোদ্ধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন। এটা কী করে সম্ভব হতে পারে। তবে, যে সংকটটা রয়েছে, আশা করি তা কাটিয়ে উঠতে পারবো।’

এক প্রশ্নের জবাবে মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আদালত থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা আসছে। আমাদের আদালতের নির্দেশনার বাইরে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। কাজেই এটা নিষ্পত্তি করেই এগুতে হবে। এজন্য কবে চূড়ান্ত তালিকা হবে সেটা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। আগে একাধিকবার ঘোষণা দিয়ে ওই সময় তা প্রকাশ করতে পারেনি। এবারও স্বাধীনতা দিবসের আগে যেসব তালিকা নিয়ে প্রশ্ন নেই, তা প্রকাশ করতে গিয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে পারিনি। এজন্য নতুন করে সময় বেঁধে দিতে চাচ্ছি না।’

জানা গেছে, গত ২৬ মার্চ ১৯ ক্যাটাগরির ১ লাখ ৯৯ হাজার ৯৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধার নামের তালিকা প্রকাশ করার প্রস্তুতি ছিল মন্ত্রণালয়ের।

প্রসঙ্গত, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অতীতে বিভিন্ন সময় তৈরি করা তালিকায় কিছু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বাদ যাওয়া এবং তালিকায় কিছু বিতর্কিতদের নাম অন্তর্ভুক্তির অভিযোগে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক তার বিগত মেয়াদে মাঠপর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে আবারও মুক্তিযোদ্ধার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। যারা এখনও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হননি, তাদের ২০১৪ সালের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে অনলাইনে আবেদন করতে বলা হয়। এতে সারাদেশ থেকে অনলাইনে ও সরাসরি ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৫০টি আবেদন পাওয়া যায়। এগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ৪৭০টি কমিটি গঠন করা হয়। কথা ছিল ২০১৫ সালের ২৬ মার্চের মধ্যে তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। কিন্তু যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন ও কমিটির সিদ্ধান্তসহ বিভিন্ন ইস্যুতে উচ্চ আদালতে একের পর এর মামলা হতে থাকে। এ কারণে উদ্যোগ নেওয়ার পরও গত ৪ বছরে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে পারেনি।

উল্লেখ্য, তালিকা চূড়ান্ত না হলেও এ মুহূর্তে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৩১ হাজার ৩৮৫ জন। এরমধ্যে ভাতা পাচ্ছেন এক লাখ আশি থেকে নব্বই হাজারের মধ্যে। মুক্তিযোদ্ধার তথ্য ভুয়া প্রমাণে কিছু ব্যক্তির নাম বাদ আবার কিছু নাম অন্তর্ভুক্তি এবং আদালতের আদেশের কারণে ভাতাভোগী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কম-বেশি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

গত জানুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত দেশে ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা এক লাখ ৮৭ হাজার ২৯৩ জন বলে একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী সংসদকে জানিয়েছিলেন।

এদিকে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, গত ২২ মে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে চলতি অর্থবছরের (২০১৮-১৯) চতুর্থ কিস্তিতে (এপ্রিল-জুন) এক লাখ ৮২ হাজার ৮৩৭ জন এবং ২৭ মে আরও ২১৪ জনের অনুকূলে ভাতা ও ঈদ বোনাস দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরও কিছু মুক্তিযোদ্ধার অনুকূলে ভাতা ও বোনাস বরাদ্দের প্রক্রিয়া রয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় চার ক্যাটাগরির মুক্তিযোদ্ধার ভাতা অব্যাহত থাকবে বলে গত ২৮ মে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিটি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকেও বিজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করে মন্ত্রণালয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভারতীয় তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা, লাল মুক্তিবার্তা তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা (যাদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ নেই), বেসামরিক ও বাহিনীর গেজেট তালিকার মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ভাতা অব্যাহত থাকবে। বেসামরিক গেজেটের মধ্যে রয়েছে—বেসামরিক গেজেট, মুজিবনগর, বিসিএস ধারণাগত জ্যেষ্ঠতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বিসিএস, স্বাধীন বাংলা বেতার শব্দসৈনিক, বীরাঙ্গনা, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল, ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনী ও বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে নিয়োজিত বা দায়িত্ব পালনকারী মুক্তিযোদ্ধা গেজেট। বাহিনী গেজেটের মধ্যে রয়েছে—সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী গেজেট, নৌ-কমান্ডো, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার বাহিনী গেজেট।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে স্থগিত হওয়া মুক্তিযোদ্ধা ভাতা সচলে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে আপিল করতে বলা হয়েছে।

তথ্য প্রযুক্তি আইনের মামলায় সাংবাদিক নেতা আজমীর তালুকদারকে অব্যাহতি

Design & Developed by: Ifad Technology