বাঙালি নারী পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা করে পুরুষের ঘাড়ে বসেই

শুক্রবার, ০৭ জুন ২০১৯ | ৮:৩৮ অপরাহ্ণ | 295 বার

বাঙালি নারী পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা করে পুরুষের ঘাড়ে বসেই

পৃথিবীতে বাঙালি নারীই হচ্ছে একমাত্র হাস্যকর জাতি যারা পুরুষের মতো হতে চায়, পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে চায়, কিন্তু সেটা করতে চায় পুরুষের ঘাড়ে বসে। পান থেকে চুল খসলে কমন ডায়লগ, ‘খাওয়াতে না পারলে বিয়ে করছে কেন?’ আরে, বিয়ে কি ছেলেরা একা করে নাকি? এ যুগের ছেলেদেরও একটা নতুন ডায়লগ ডেভেলপ করা দরকার, ‘তুমি বসেছিলে বলেই বিয়ে করছিলাম, খাওয়াইতো চাকর-বাকরকেও।’

গত বছর আনিসুল হক স্যার এই বিষয়ে আমার একটা পোস্ট শেয়ার করেছিলেন। সেদিনের সেই পোস্টটা তিন ঘণ্টার মধ্যে ১২২টা শেয়ার হয়েছিল। বুঝতে পেরেছিলাম বাঙালি পুরুষ বড় নাজুক অবস্থার মধ্যে আছে। আমি যেন ওদের না বলা কথাগুলোই তুলে ধরেছিলাম। পোস্টটার বিষয়বস্তু ছিল বাংলাদেশে মেয়ের মায়েদের অযথা হস্তক্ষেপের কারণে মেয়ের সংসারে অশান্তি প্রসঙ্গে। কতো সংসার যে ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে এই দুপক্ষের মা’দের ইগো ক্লেশের কারণে। যদিও ছেলের মায়েরাও কোয়ালিটির দিক থেকে এর চাইতে খুব একটা উন্নততর নয়, তবুও মনে হচ্ছে আমাদের দেশের মেয়েদের তুলনায় ছেলেরাই দুরবস্থাপন্ন ইদানিং।

বিয়ে ভাঙলে ক্ষতি কি কেবল মেয়েদের একার হয় নাকি? কলঙ্কের দাগ কি পুরুষের গায়ে লাগে না

এখন তো আরও সুবিধা। বাংলাদেশ সরকার মেয়েদের পক্ষে কীসব আইন করেছে, পান থেকে চুন খসলে আম্মা, আব্বা, ভাইয়া, আপা, আত্মীয়-স্বজন নির্বিশেষে গ্যাতি-গোষ্ঠী সবাই মিলে বরের কাছ থেকে কাবিনের টাকাটা হাতিয়ে নেন। সন্তান থাকলে পিতার সেই সন্তানের ভরণ-পোষণের দায়িত্বভার নিতে হবে এই আইনের যুক্তি আছে। নিম্ন শ্রেণির নির্যাতিত মেয়েদের জন্য নারী নির্যাতন আইনেরও অপরিহার্যতা আছে। কিন্তু কাবিনের টাকার ব্যাপারটা কিছুটা গোলমেলে। বলে যে ছাড়বে তাকেই কাবিনের টাকা দিতে হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত কোন পুরুষকে কাবিন পেতে শুনিনি। এতো দেখছি এক নির্যাতন বন্ধ করতে আরেক নির্যাতনের সূচনা। বিয়ে ভাঙলে ক্ষতি কি কেবল মেয়েদের একার হয় নাকি? কলঙ্কের দাগ কি পুরুষের গায়ে লাগে না? নারীকে পুরুষের সমান অধিকার দাও। কই কাবিনের টাকাটা তো সমান ভাগে ভাগ করেন না। মানুষ কতটা আত্মসম্মানবোধহীন হলে নিজের ক্ষতিপূরণ করতে অন্যের রক্তে অর্জিত আয়ের ওপর নির্দ্বিধায় ভাগ বসায়।

বিয়েতে আবার ক্ষতিপূরণ কিসের? এটা কি ব্যবসা নাকি যে ব্যাংক ক্রাপ্ট হবে? তাও আবার ব্যাংক ক্রাপ্ট হয় এক পার্টনারের। যদি ব্যবসাও ধরি, ব্যবসার নিয়মানুযায়ী তাহলে বিয়েটা হবে পার্টনারশিপ। মিনিমাম দু’জন পার্টনার নিয়ে লিমিটেড কোম্পানির মতো। আরে লিমিটেড কোম্পানির পার্টনারশিপেওতো ইনভেস্টমেন্ট অনুযায়ী প্রফিট অ্যান্ড লস দুটোই সমানভাগে দুই পার্টনারের মধ্যে ভাগ হয়। এতো একমাত্র ডাকাতির পর্যায়েই পড়ে।

আমাদের দেশের ছেলেদের এ নিয়ে বিরোধ করা দরকার। কিন্তু ওরা করবে না। কারণ পৃথিবীতে ছেলেরা মেয়েদের মতো অবলা নয়, যদিও ওরাই বলে কম। তাই বোধহয় রবীন্দ্রনাথ রসিকতা করে মৈত্রীয় দেবীকে বলেছিলেন, ‘তোমরা অবলারা এতো বল কেনগো বলতে পারো?’ পুরুষ বরাবরই দায়িত্ববান, মর্যাদাবান। ওরা জানে অধিকার এবং সম্পদ অর্জন করতে হয়। সরকার রাষ্ট্রীয় আইনের দ্বারা যাদের অধিকার আদায় করতে বাধ্য করে তারা ‘পিপল উইথ স্পেশাল নিডস’।

প্রতিবন্ধীর তো ক্ষমতা নেই, শারীরিক, মানসিকভাবে তারা অক্ষম। কিন্তু মেয়েরা কি অক্ষম? বিশেষ করে যদি সে হয় ঊনিশ শতকের নারী! একদিন বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষীয় বাঙালি মধ্যবিত্তই ছিল এই জাতির সংস্কার ও মূল্যবোধের একমাত্র ভিত্তি। বাঙালি মধ্যবিত্তই এই গোটা বাঙালি জাতিকে একদিন সমৃদ্ধ করেছিল।

আজকের মধ্যবিত্ত বাঙালি যেটা হারাচ্ছে সেটা হলো মূল্যবোধ, আত্মসম্মানবোধ। আধুনিক বাংলাদেশে বিয়ে ভেঙে মেয়ের জীবনের মূল্য আদায় করতে সপরিবারে নির্দ্বিধায় আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যেতে মধ্যবিত্ত বাঙালির আর মানসম্মানে বাধে না। টাকা দিয়ে কি মানসম্মানের ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব? ঘর-সংসার, মানসম্মান যাবে যাক, কিন্তু মধ্যবিত্ত বাঙালির আজ টাকা চাই। অথচ একদিন এই আদর্শ, নীতি, মানসম্মানের জন্যই এই মধ্যবিত্ত সকল বৈষয়িক সুখ-শান্তি, লোভ-লালসাকে মুহূর্তে তুচ্ছ করে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।

আগে যেমন মেয়ে হলে বাঙালি অখুশি হতো, সেদিন আর দূরে নয় যখন বাংলাদেশে কন্যাসন্তান মানেই হবে বিরাট এক আয়ের উৎস, আর পুত্রসন্তান মানেই হবে বিরাট বোঝা। তাতে কি? পুরুষতো যুগ যুগ ধরে এই বোঝা বয়ে অভ্যস্ত, তাই দিন শেষে পুরুষই খেটে মরবে। আপাতদৃষ্টিতে আমার লেখাটি নারীর বিপক্ষে মনে হলেও, আসলে লেখাটির উদ্দেশ্য ন্যায়ের পক্ষে। অর্থাৎ লেখাটি পুরুষের ওপর অন্যায়ের বিপক্ষে। এ কথা সত্য একদিন পুরুষ নারীর ওপর অন্যায় করেছিল, কিন্তু একথাও ভুলে গেলে চলবে না যে একদিন নারী নির্যাতন বন্ধ করে নারীকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে সেই পুরুষই সক্রিয় হয়েছিল। পুরুষে পুরুষে যেমন ভেদাভেদ আছে, তেমনি নারী জাতেরও ভিন্নতা আছে। সুতরাং আজ যেটুকু নারী এগিয়েছে এর পেছনে পুরুষের অবদান অস্বীকার করা যায় না। এখানে নির্যাতনের বিচার না করার আভাস নেই, তবে নির্যাতনের নামে নির্লজ্জের মতো যারা পুরুষের অর্জন নির্দ্বিধায় আত্মসাৎ করতে চায়, সেইসব নারীকে কাপুরুষের মতো কুনারী আখ্যা দেয়া প্রয়োজন।

আমি নিজেই যেহেতু নারী, স্বাভাবিকভাবেই আমি শতভাগ নারী উন্নয়নের পক্ষে। তবে আমি নারী উন্নয়নের নাম করে, অবলা দাবি করে ফায়দা লুটার বিপক্ষে। একদিন এবং আজো যদি পুরুষ নারী উন্নয়নের পক্ষে দাঁড়ায় তাহলে মেয়েরা কেন, কিসের অভাবে পুরুষের পক্ষ নিতে পারে না? নারী মনের এই সংকীর্ণতার জন্যও কি পুরুষই দায়ী? আজ এই একুশ শতাব্দীতে আর সতীদাহ প্রথা, বাল্যবিবাহ, বিধবা আইন এইসব মান্ধাতা গল্প বলার দিন শেষ হয়েছে। আর কতো চোখের জল আর করুণা ভিক্ষা? আমাদের বাংলাদেশে যেখানে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, মন্ত্রী, সংসদের স্পিকার, ব্যাংকের প্রধানসহ প্রায় সবই নারী, নারীকে করুণা করার দিনও ফুরিয়েছে। গতবার চট্টগ্রাম পাসপোর্ট অফিসে গেলাম, টপ র‌্যাংক থেকে নিম্ন শ্রেণির টাইপিস্ট মিলে আগ্রাবাদ ব্রাঞ্চে মোট চৌদ্দজন নারী।

সুতরাং এদের অবলা বলার দিন শেষ, অবলা এখন সবলা হয়েছে। এখন দায়িত্ব নেয়ার পালা, মেকআপ আর পার্লার কম, কাজ বেশি। পশ্চিমা কোন নারী স্বামীর ঘাড়ে বসে খায়? সেজন্যই ওদের ওখানে নারী উন্নয়ন হয়েছে। শুধু আইন নয়, দায়িত্ব পালন করছে ওরা। নইলে রাষ্ট্রীয় আইন ও সামাজিকীরণে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতো। যেকোনো সুস্থ ইকোনমির লক্ষণ হচ্ছে টাকার বিপরীতে যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ গচ্ছিত রাখা। এই টাকা সম্পদের তুলনায় বেশি হলে ইনফ্লেশন (দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি) হয়, কম হলে ডিফ্লেশন (দ্রব্যমূল্য হ্রাস) হয়। দুটোই দেশের অর্থনৈতিক দুর্যোগ এনে দেয়। আমাদের আধুনিক নারী অধিকারেও ইনফ্লেশন চলছে।

আধুনিক সমাজ, সংসার, কর্মক্ষেত্রে সবক্ষেত্রে নারী তার পূর্ণ অধিকার দাবি করছে, কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণে দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি, অক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে। নিম্ন শ্রেণির মেয়েদের উন্নয়ন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর হাতে। কেবল নারী নির্যাতন দমন করলে নারীর উন্নয়ন হয় না। নির্যাতিতাকে রক্ষা করা হয় মাত্র। আইনস্টাইন যেমন বলতেন, ‘এক সমস্যার সমাধান আরেক সমস্যা দিয়ে হয় না’, তেমনি এক অন্যায়ের প্রতিরোধ আরেক অন্যায় দিয়ে হয় না। এতে কেবল বিশৃঙ্খলাই বাড়ে, আর সেই বিশৃঙ্খলার জলজ্যান্ত প্রমাণ আধুনিক বাঙালি সমাজের চিত্র।

লেখক : ডাবলিন ট্রিনিটি কলেজের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী।

বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম: ভাটি বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির এক কীর্তিমান শিল্পীবাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। আজ ১২ সেপ্টেম্বর বাউল শাহ আব্দুল করিমের মৃত্যুবার্ষিকী। সাধারণত উল্লেখযোগ্য কোনো গায়ক-কবি-সাহিত্যিকের মৃত্যুবার্ষিকী কিংবা জন্মবার্ষিকীতে আমরা তার কবিতা পাঠ করি, গল্প পড়ি কিংবা গান শুনে তার সৃষ্টির তাৎপর্য বুঝতে চেষ্টা করি, তাকে স্মরণ করি ও তাকে অনুভব করার মাধ্যমে দিনাতিপাত করি। তাছাড়া সারা বছরই হয়তো তার কবিতা আবৃত্তি বা গান শোনা হয়ে উঠে না, যদিও ব্যক্তিবিশেষে এর ব্যতিক্রম ঘটতে পারে। তবে আমার ধারণা, বাংলাদেশে শাহ আব্দুল করিমের ক্ষেত্রে এই চর্চার ব্যত্যয় ঘটে যায়। তার কারণ আমি নিশ্চিত করে বলে দিতে পারি যে প্রতিটি মুহূর্তে বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও শাহ আব্দুল করিমের গান বাজতে শোনা যায় কিংবা হয়তো মনের অজান্তেই কেউ গেয়ে ওঠে। এত অল্প সময়ে এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠা শিল্পী সারা বিশ্বে হয়তো খুব কমই আছেন বলে আমার বিশ্বাস। উপরন্তু, শাহ আব্দুল করিমের গান গেয়ে অনেকেই বিখ্যাত হয়ে গেছেন এরকম নজির আছে। আমি দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা যেকোনো একটি বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখতে গিয়ে যে পরিমাণ পরিশ্রম ও মেধা খরচ করেন এতে মাঝে মাঝে অবাক লাগে যে পড়লেখা না জানা, গানের ব্যাকরণ পড়তে না পারা এমন অনেকেই খুব সহজেই বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র অনায়াসে বাজাতে পারছেন। আমি নিজেও ছাত্রজীবন থেকেই দেশীয় বাদ্যযন্ত্রগুলো শেখার জন্য উৎসাহী ছিলাম, সময়ের অভাবেই হোক কিংবা যথেষ্ট চেষ্টার অভাবেই হোক সামান্য টুংটাং ছাড়া কিছুই শিখতে পারিনি, গান রচনা করা তো দূরের ব্যাপার।  প্রাথমিক ধারণা থেকে কোনো চিন্তা না করেই বলে দেয়া যায় যে শাহ আব্দুল করিমের রচিত গানগুলো গণমানুষের গান। এছাড়াও, এই ভূখণ্ডে অধ্যাত্মচেতনা, দেহতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, দেশপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম ইত্যাদি বিষয়নির্ভর গান সমাদৃত হয়েছে কালে কালে। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম এই সকল বিষয়েই গান রচনা করেছেন আঞ্চলিক ভাষায়। পাশাপাশি একজন কীর্তিমান চিত্রশিল্পী যেভাবে চিত্রকর্মের মাধ্যমে বিষয়বস্তু  ফুটিয়ে তোলেন তেমনি তার গানের মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন চক্র, ভাটি বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি ও শ্বাশ্বত বাংলার মানুষের যাপিত জীবনের চিত্র। আবহমান কাল থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনা ও চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্য, জীবন-দর্শন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তিনি ভেবেছেন, গানের কথার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন সাবলীলভাবে। তার যে কয়েকটি গানে ভাটি বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন ধারা ও হাওরের মানুষের জীবনের চিত্র উঠে এসেছে তার কিছু দিক নিয়ে আলোচনা করা হলো এখানে।    বাউল শাহ আব্দুল করিমের হাওর পাড়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন সম্পর্কে যে কয়টি গান আছে তার মধ্যে প্রথমেই সর্বাধিক জনপ্রিয় একটি গানের কথা উঠে আসে, আর সেটি হল ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’। এই গানে ফুটে উঠেছে হাওর অঞ্চলের মানুষের বর্ষাকালের চিত্র। হাওরে পানি যখন চারিদিকে থৈ থৈ করে, পানিবন্দী কৃষকের কৃষিকাজ বন্ধ থাকে, তখন বিনোদন হিসেবে বর্ষাকালে গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় যাত্রা, পালাগান, কীর্তন, গাজির গান, ঘাটু গান ইত্যাদি লেগেই থাকে। কোনো না কোনো উপলক্ষ্য পেলেই খাওয়াদাওয়া, আনন্দ করা ইত্যাদি নিমিষেই শুরু হয়ে যায়। এর মধ্যে তখনকার দিনে নৌকাবাইচ হত খুব ঘটা করে যা আব্দুল করিম তার জীবদ্দশায়ই এই চর্চার অবশিষ্ট নেই বলে উল্লেখ করে গেছেন।  বর্ষাকালে ধুমধাম আনন্দের একটা কারণ হলো পানিবন্দী জীবনে বিনোদন নিয়ে আসা আবার অর্থনৈতিক একটা দিক আছে আর সেটা হলো, চৈত্র-বৈশাখ মাসে কৃষকের ঘরে ধান ওঠে, তারপর অবস্থা অনুযায়ী কয়েক মাস সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে সচ্ছল থাকে। এর কয়েক মাস পরেই শুরু হয় টানাপোড়েন, ধার-কর্জ-ঋণ নেয়া। সুদে ধার-কর্জ নিয়ে একটা দুষ্টুচক্রে পড়ে যায় কৃষক যা ভয়ংকর হয়ে দাঁড়ায় এক সময়। যারা দিনমজুরে যেতে পারেন তাদের আয় কিছুটা হলেও অন্যদিকে যারা লোক-লজ্জার ভয়ে দিনমজুরি করতে পারেন না না তাদের কষ্ট হয় সব থেকে বেশি। এই বিষয়টিও শাহ আব্দুল করিম তার গানে উল্লেখ করেছেন বিনীতভাবে। যেমন- ‘আল্লায় যেন কর্জের লাগি কেউর বাড়িত নেয় না, মজুরি করিয়া খাইমু ভাত যদি খাইতে পাই না।’ সাথে এটাও বলেছেন, গোঁড়াকাল থেকেই হাওরের কৃষকের এই ধার-কর্জ করার প্রক্রিয়া বিদ্যমান কিন্তু পূর্বে ধার-কর্জ হত বিনা সুদে, অন্তত মানবিকতার একটা সুতা ছিল তখন কিন্তু এখন ধার-কর্জ নিতে হয় চড়া সুদে বলে গানে উল্লেখ আছে, এমনকি আপন চাচাত ভাইয়েরাও চশমখোর হয়ে পড়ে। অবশ্য, সকল সমাজেই চাচাত ভাইদের চশমখোর হওয়ার গল্প আছে যা বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন রচনায় উল্লেখ আছে। যেমন- মহাভারতে কৌরবরা যারা পাণ্ডবদের নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছিল এবং যার প্রকৃত কারণে পরবর্তীতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। আবার গৌতম বুদ্ধের চাচাত ভাইয়ের সম্পর্কেও চশমখোর হওয়ার গল্প প্রচলিত আছে। তেমনি, বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের গানেও এই যুগে ‘সাক্ষাত চাচাত ঘরের ভাই চশম-ভরম করে না’ বলে উল্লেখ আছে যা এই ভূখণ্ডের মানুষের চিরায়ত স্বভাব হিসেবে বিভিন্ন রচনায় উল্লেখ আছে।     শাহ আব্দুল করিমের আরেকটি গানে উল্লেখ আছে সংসার বড় হওয়ার দরুণ জমিজামা বিক্রি করে খাওয়া-পড়া চালানোর মতো অর্থও নেই। এমন অবস্থা হাওর অঞ্চলের বেশির ভাগ কৃষকের হয়ে থাকে।  একজন শাহ আব্দুল করিমকে পাঠ করার মাধ্যমে সমাজকে পাঠ করা সম্ভব, যেহেতু তিনি তার গানের মাধ্যমে গ্রামীণ চাল-চলনের সমগ্র চিত্র উপস্থাপন করে গেছেন। শাহ আব্দুল করিমের ‘কষ্ট করে আছি এখন বাইচ্চা’ গানের কয়েক কলি পরে উল্লেখ আছে ‘সংসার বড় হইল, খোরাকির টান পড়ে গেল, জমিজামা যাহা ছিল, সব ফালাইছি বেইচ্চা’– এই অবস্থা শুধু যে বাউল শাহ আব্দুল করিমের বাউল হয়ে ওঠার জন্যই হয়েছে তা নয়, এই অঞ্চলের মানুষের সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের ক্ষেত্রে সংসার বড় হওয়ার পর কী অবস্থা দাঁড়ায় তার চিত্র আমাদের সকলের জানা আছে, তারই উল্লেখ আব্দুল করিমের গানে উঠে এসেছে। তবে ব্যতিক্রম তো অবশ্যই আছে। সম্পদশালী গৃহস্থদের অবস্থা সব সময়ই ভালো ছিল এ অঞ্চলের। এক সময় জীবিকা বলতে দুটিই ছিল, একটি হলো কার্তিক-অগ্রাহায়ণ থেকে চৈত্র-বৈশাখ মাস নাগাদ কৃষিকাজ করা; দুই- বাকি সময়টা মাছ ধরা। তাছাড়া যাদের জমিজামা প্রচুর তাদের এসবের কিছুই ছোঁয় না। আব্দুল করিমের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার জন্য এসবকিছুই তার গানের কলিতে উঠে এসেছে। হয়তো শতবছর পর গ্রাম শহর হয়ে যাবে, মানুষের জীবিকা পরিবর্তিত হয়ে যাবে, ধানক্ষেত খুজে পাওয়া যাবে না, কিন্তু তখন শাহ আব্দুল করিমের গানে ভাটি বাংলার এই চিত্রগুলো ভাসতেই থাকবে। ভবিষ্যতের কথা কে জানে! শাহ আব্দুল করিম গান রচনা করেছেন সৃষ্টির আনন্দে, বিখ্যাত হওয়ার মানসিকতা নিয়ে নয়। অথচ তিনিই বনে গেলেন সমগ্র বাংলাদেশে একজন প্রখ্যাত শিল্পী, দার্শনিক ও চিন্তাবিদ।   শাহ আব্দুল করিমের বিভিন্ন গানে ‘ময়ূরপঙ্খী নাও’ এর উল্লেখ আছে বহুবার। তিনি অনেকটা শাব্দিক অর্থের সাথে সাথে রূপক অর্থেও শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এরকম শত শত শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন যার অর্থ দুই রকম দাঁড়ায়। চারিদিকে পানি যখন টইটুম্বুর, হাওর অঞ্চলের মানুষের প্রধান যানবাহন হয়ে উঠে নৌকা। নৌকা ছাড়া কোথাও যাওয়ার কোনো উপায় নাই। অতএব, গানে আছে তারা সন্ধ্যার পর নৌকা নিয়ে হাওরে থাকা পছন্দ করে না এবং সূর্য ডুবে যাওয়া তাদের কাছে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। তবে বাস্তবিক অর্থে যেদিন থেকে বৈদ্যুতিক তার ঢুকেছে হাওরে সেদিন থেকে হাওরের সৌন্দর্য ম্লান হওয়া শুরু হয়েছে বলে আমার ধারণা। কিন্তু সভ্যতা বিকাশের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তাও অনেক। যাহোক, শাহ আব্দুল করিমের গানের বেশির ভাগ শব্দই ভাটি বাংলার সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো মনে করিয়ে দেয় বারবার। যেমন- ‘ময়ূরপঙ্খি নাও’, ‘বইঠা বাওয়া’, ‘পঞ্চায়েত’, ‘জারিগান’, ‘সারিগান’, ‘বাউলাগান’ ইত্যাদি ।      নির্ভেজাল মানুষ শাহ আব্দুল করিম ঝগড়া পছন্দ করতেন না বলে গানে উল্লেখ করেছেন। পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজনের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখার কথা উল্লেখ করেছেন। একটি গানে উঠে এসেছে ‘গোসসা করার’ কথা, ‘মুরুগ জবো’ করে খাওানোকে ঘিরে কী কী ঘটে যায় তার কথা। হাওর অঞ্চলের মানুষেরা আত্মীয়-স্বজনকে আপ্যায়ন করতে যেসব খাবার আয়োজন করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ঘরের মুরুগ জবাই দিয়ে খাওয়ানো এবং মুরুগ জবাই দেয়ার পর আশেপাশে প্রতিবেশীদের দাওয়াত না দিলে কিংবা অন্তত তরকারি না পাঠালে শুরু হয়ে যায় ‘গোসসার পর্ব’। তখন এক পর্যায়ে ঝগড়াও হয়ে যায়। এই বিষয়টিও শাহ আব্দুল করিম তার গানে ফুটিয়ে তুলেছেন যা গ্রামের মানুষের অতিথি আপ্যায়নের বেলায় বারংবার সম্মুখীন হতে হয়। এরকম অনেক বিষয়েই বিদ্যমান চর্চা ও অভ্যাসগুলো খুব সাবলীলভাবে সাহসিকতার সাথে নিঃসঙ্কোচে প্রকাশ করেছেন শাহ আব্দুল করিম।    শাহ আব্দুল করিম গ্রামীণ ঐতিহ্যের যেসব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বারবার গানের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরেকটি হলো গ্রাম্য মেলা। মেলার বর্ণনা বিশদভাবেই গানের কথার মাধ্যমে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যেন মনে হচ্ছে এটি সত্যিকারভাবেই একটি উপভোগ্য বিষয়। এই ক্ষেত্রেও মেলা উপলক্ষ্যে মানুষ মানুষকে সুদমুক্ত ঋণ দেয়ার প্রচলন ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি, ধলমেলার পরিপ্রেক্ষিতে যা লেখা আছে তাতে আবহমান কাল থেকে হাওরের মানুষের জীবনে ঘটে আসা ঐতিহ্য ও কৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছেন। এ ধরনের গানের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহ্য বিলোপের আবহ ফুটিয়ে তুলেছেন এবং সত্যিকার অর্থেই কালের বিবর্তনে হয়তো কবিতা-গান-গল্প ইত্যাদি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা ছাড়া বাস্তবে একসময় আর খুঁজে পাওয়া যাবে না বাউলেপনা, হাওর পাড়ের সংস্কৃতিসহ আরও বিভিন্ন বিষয়।   কৃষিকাজ ও কৃষিপণ্যের উল্লেখ পাওয়া যায় আব্দুল করিমের গানে যার বেশির ভাগই এখন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিপন্ন হওয়ার পথে। যেমন- লাঙল, জাল ইত্যাদি। এছাড়া, খাদ্যে ভেজাল ও গ্রামীণ  মেলার পণ্যের বিবরণও পাওয়া যায় তার গানের কথায়। ফসল রোপন থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলার কথা বলা আছে। সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত হলে ফলন ভালো হয়, আবার খরা-অতিবৃষ্টির কারণে ফলন নষ্ট হয় এসবের বর্ণনা আছে তার একটি গানে-  ‘এবার ফসল ভালো দেখা যায় বা-চাচাজী  এবার ফসল ভালো দেখা যায়  ফাল্গুনে বর্ষিল মেঘ  জমি যাহা চায়-বা চাচাজী।’    একই গানে বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতের বিষয়ে উল্লেখ আছে যা সত্যিকারভাবেই হাওর অঞ্চলের মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। খরা, অকাল বন্যা, অতিবৃষ্টি ,শিলাবৃষ্টি ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষকের স্বপ্নকে কেড়ে নেয়। শাহ আব্দুল করিমের গানে এই বিষয়ের উল্লেখ আছে এভাবে-  ‘শিলাবৃষ্টি অকাল বন্যায়  বারেবারে ছাতায়  রাইত হলে ঘুম ধরে না নানান চিন্তা বা-চাচাজি।।  ইরি বোরো ফসল করি আমাদের এলাকায়  এক ফসল বিনে আমাদের  নাই অন্য উপায়-বা চাচাজী।’  সুনামগঞ্জের হাওরের ফসল প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিভিন্ন সময়েই আঘাত হেনেছে যা মানুষের কাছে প্রতিবারই ফসল তোলার সময়টায় একটা ভয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।    নদী ও নদীপাড়ের জীবনের কথা তার বিভিন্ন গানে পাওয়া যায়। বর্ষাকালে নদী হাওরের পানিতে প্লাবিত হয় তখন নদীকে চেনা দুষ্কর হয়ে পড়ে যেখানে চৈত্রমাসে মেলার সময় মানুষ নদীরপাড়ে বসে থাকত সেখানে বর্ষাকালে নদী চিহ্নিত করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। তবে স্থানীয় মাঝি ও জেলেরা এমনকি ছোট ছোট বাচ্চারাও বলে দিতে পারে নদীর গতিপথ। এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো তার কয়েকটি গানে উল্লেখ আছে যা বাস্তবিক অর্থেই নদী আছে এমন হাওরের জনপদের জন্য জানা পানির মত সহজ ।   বাউল সাধক শাহ আব্দুল করিমের বাল্যকালের বিভিন্ন বিষয় ফুটে উঠেছে তার গানে। এরই মাধ্যমে ভাটি এলাকার শিশুদের বিনোদন, খেলাধুলার উপকরণ, বেড়ে ওঠার চিত্র খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। এরমধ্যে – বিয়ের গান গাওয়া, ধুলাবালি নিয়ে খেলা, মার্বেল খেলা, পুতুল খেলা, লুকালুকি খেলা ইত্যাদির বর্ণনার সাথে সাথে ছোট ছোট বাচ্চাদের মুখে মুখে প্রচলিত কিছু ভীতিকর বিষয়ের বর্ণনা আছে যেমন- দাঁত পরে গেলে যদি কাকে দেখে ফেলে তো দাঁত আর উঠবে না, কিংবা পোকা ধরা আম খেলে সাঁতার শেখা যায় ইত্যাদি বিষয় এই অঞ্চলের গ্রামের শিশুদের মনের মধ্যে গেঁথে থাকে।  বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের গানের কথায় গ্রামীণ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষ্টিসহ আবহমান কাল থেকে ঘটে আসা বিষয়গুলোও তার আধ্যাত্মিক চর্চার পাশাপাশি গানের কলিতে উঠে এসেছে। এসব বিষয়াদি কবিতা-গল্প-গানে না থাকলে সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে। ইতোমধ্যেই অনেক বিষয়, ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে যা শাহ আব্দুল করিম জীবদ্দশাতেই বিদ্যমান ছিল অথচ এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে, আশ্চর্যের বিষয় হলো স্বশিক্ষিত শাহ আব্দুল করিম এই বিলুপ্ত হওয়ার প্রক্রিয়া আঁচ করতে পেরেছিলেন এবং তার গানের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় বর্ণনার পাশাপাশি আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন একজন চিত্রশিল্পী যেভাবে নিখুঁতভাবে ছবি আঁকেন ঠিক সেভাবেই। তার প্রয়াণ দিবসে আমরা তার আত্মার শান্তি কামনা করি।

বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম: ভাটি বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির এক কীর্তিমান শিল্পীবাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। আজ ১২ সেপ্টেম্বর বাউল শাহ আব্দুল করিমের মৃত্যুবার্ষিকী। সাধারণত উল্লেখযোগ্য কোনো গায়ক-কবি-সাহিত্যিকের মৃত্যুবার্ষিকী কিংবা জন্মবার্ষিকীতে আমরা তার কবিতা পাঠ করি, গল্প পড়ি কিংবা গান শুনে তার সৃষ্টির তাৎপর্য বুঝতে চেষ্টা করি, তাকে স্মরণ করি ও তাকে অনুভব করার মাধ্যমে দিনাতিপাত করি। তাছাড়া সারা বছরই হয়তো তার কবিতা আবৃত্তি বা গান শোনা হয়ে উঠে না, যদিও ব্যক্তিবিশেষে এর ব্যতিক্রম ঘটতে পারে। তবে আমার ধারণা, বাংলাদেশে শাহ আব্দুল করিমের ক্ষেত্রে এই চর্চার ব্যত্যয় ঘটে যায়। তার কারণ আমি নিশ্চিত করে বলে দিতে পারি যে প্রতিটি মুহূর্তে বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও শাহ আব্দুল করিমের গান বাজতে শোনা যায় কিংবা হয়তো মনের অজান্তেই কেউ গেয়ে ওঠে। এত অল্প সময়ে এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠা শিল্পী সারা বিশ্বে হয়তো খুব কমই আছেন বলে আমার বিশ্বাস। উপরন্তু, শাহ আব্দুল করিমের গান গেয়ে অনেকেই বিখ্যাত হয়ে গেছেন এরকম নজির আছে। আমি দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা যেকোনো একটি বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখতে গিয়ে যে পরিমাণ পরিশ্রম ও মেধা খরচ করেন এতে মাঝে মাঝে অবাক লাগে যে পড়লেখা না জানা, গানের ব্যাকরণ পড়তে না পারা এমন অনেকেই খুব সহজেই বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র অনায়াসে বাজাতে পারছেন। আমি নিজেও ছাত্রজীবন থেকেই দেশীয় বাদ্যযন্ত্রগুলো শেখার জন্য উৎসাহী ছিলাম, সময়ের অভাবেই হোক কিংবা যথেষ্ট চেষ্টার অভাবেই হোক সামান্য টুংটাং ছাড়া কিছুই শিখতে পারিনি, গান রচনা করা তো দূরের ব্যাপার। প্রাথমিক ধারণা থেকে কোনো চিন্তা না করেই বলে দেয়া যায় যে শাহ আব্দুল করিমের রচিত গানগুলো গণমানুষের গান। এছাড়াও, এই ভূখণ্ডে অধ্যাত্মচেতনা, দেহতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, দেশপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম ইত্যাদি বিষয়নির্ভর গান সমাদৃত হয়েছে কালে কালে। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম এই সকল বিষয়েই গান রচনা করেছেন আঞ্চলিক ভাষায়। পাশাপাশি একজন কীর্তিমান চিত্রশিল্পী যেভাবে চিত্রকর্মের মাধ্যমে বিষয়বস্তু ফুটিয়ে তোলেন তেমনি তার গানের মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন চক্র, ভাটি বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি ও শ্বাশ্বত বাংলার মানুষের যাপিত জীবনের চিত্র। আবহমান কাল থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনা ও চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্য, জীবন-দর্শন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তিনি ভেবেছেন, গানের কথার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন সাবলীলভাবে। তার যে কয়েকটি গানে ভাটি বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন ধারা ও হাওরের মানুষের জীবনের চিত্র উঠে এসেছে তার কিছু দিক নিয়ে আলোচনা করা হলো এখানে। বাউল শাহ আব্দুল করিমের হাওর পাড়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন সম্পর্কে যে কয়টি গান আছে তার মধ্যে প্রথমেই সর্বাধিক জনপ্রিয় একটি গানের কথা উঠে আসে, আর সেটি হল ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’। এই গানে ফুটে উঠেছে হাওর অঞ্চলের মানুষের বর্ষাকালের চিত্র। হাওরে পানি যখন চারিদিকে থৈ থৈ করে, পানিবন্দী কৃষকের কৃষিকাজ বন্ধ থাকে, তখন বিনোদন হিসেবে বর্ষাকালে গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় যাত্রা, পালাগান, কীর্তন, গাজির গান, ঘাটু গান ইত্যাদি লেগেই থাকে। কোনো না কোনো উপলক্ষ্য পেলেই খাওয়াদাওয়া, আনন্দ করা ইত্যাদি নিমিষেই শুরু হয়ে যায়। এর মধ্যে তখনকার দিনে নৌকাবাইচ হত খুব ঘটা করে যা আব্দুল করিম তার জীবদ্দশায়ই এই চর্চার অবশিষ্ট নেই বলে উল্লেখ করে গেছেন। বর্ষাকালে ধুমধাম আনন্দের একটা কারণ হলো পানিবন্দী জীবনে বিনোদন নিয়ে আসা আবার অর্থনৈতিক একটা দিক আছে আর সেটা হলো, চৈত্র-বৈশাখ মাসে কৃষকের ঘরে ধান ওঠে, তারপর অবস্থা অনুযায়ী কয়েক মাস সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে সচ্ছল থাকে। এর কয়েক মাস পরেই শুরু হয় টানাপোড়েন, ধার-কর্জ-ঋণ নেয়া। সুদে ধার-কর্জ নিয়ে একটা দুষ্টুচক্রে পড়ে যায় কৃষক যা ভয়ংকর হয়ে দাঁড়ায় এক সময়। যারা দিনমজুরে যেতে পারেন তাদের আয় কিছুটা হলেও অন্যদিকে যারা লোক-লজ্জার ভয়ে দিনমজুরি করতে পারেন না না তাদের কষ্ট হয় সব থেকে বেশি। এই বিষয়টিও শাহ আব্দুল করিম তার গানে উল্লেখ করেছেন বিনীতভাবে। যেমন- ‘আল্লায় যেন কর্জের লাগি কেউর বাড়িত নেয় না, মজুরি করিয়া খাইমু ভাত যদি খাইতে পাই না।’ সাথে এটাও বলেছেন, গোঁড়াকাল থেকেই হাওরের কৃষকের এই ধার-কর্জ করার প্রক্রিয়া বিদ্যমান কিন্তু পূর্বে ধার-কর্জ হত বিনা সুদে, অন্তত মানবিকতার একটা সুতা ছিল তখন কিন্তু এখন ধার-কর্জ নিতে হয় চড়া সুদে বলে গানে উল্লেখ আছে, এমনকি আপন চাচাত ভাইয়েরাও চশমখোর হয়ে পড়ে। অবশ্য, সকল সমাজেই চাচাত ভাইদের চশমখোর হওয়ার গল্প আছে যা বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন রচনায় উল্লেখ আছে। যেমন- মহাভারতে কৌরবরা যারা পাণ্ডবদের নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছিল এবং যার প্রকৃত কারণে পরবর্তীতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। আবার গৌতম বুদ্ধের চাচাত ভাইয়ের সম্পর্কেও চশমখোর হওয়ার গল্প প্রচলিত আছে। তেমনি, বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের গানেও এই যুগে ‘সাক্ষাত চাচাত ঘরের ভাই চশম-ভরম করে না’ বলে উল্লেখ আছে যা এই ভূখণ্ডের মানুষের চিরায়ত স্বভাব হিসেবে বিভিন্ন রচনায় উল্লেখ আছে। শাহ আব্দুল করিমের আরেকটি গানে উল্লেখ আছে সংসার বড় হওয়ার দরুণ জমিজামা বিক্রি করে খাওয়া-পড়া চালানোর মতো অর্থও নেই। এমন অবস্থা হাওর অঞ্চলের বেশির ভাগ কৃষকের হয়ে থাকে। একজন শাহ আব্দুল করিমকে পাঠ করার মাধ্যমে সমাজকে পাঠ করা সম্ভব, যেহেতু তিনি তার গানের মাধ্যমে গ্রামীণ চাল-চলনের সমগ্র চিত্র উপস্থাপন করে গেছেন। শাহ আব্দুল করিমের ‘কষ্ট করে আছি এখন বাইচ্চা’ গানের কয়েক কলি পরে উল্লেখ আছে ‘সংসার বড় হইল, খোরাকির টান পড়ে গেল, জমিজামা যাহা ছিল, সব ফালাইছি বেইচ্চা’– এই অবস্থা শুধু যে বাউল শাহ আব্দুল করিমের বাউল হয়ে ওঠার জন্যই হয়েছে তা নয়, এই অঞ্চলের মানুষের সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের ক্ষেত্রে সংসার বড় হওয়ার পর কী অবস্থা দাঁড়ায় তার চিত্র আমাদের সকলের জানা আছে, তারই উল্লেখ আব্দুল করিমের গানে উঠে এসেছে। তবে ব্যতিক্রম তো অবশ্যই আছে। সম্পদশালী গৃহস্থদের অবস্থা সব সময়ই ভালো ছিল এ অঞ্চলের। এক সময় জীবিকা বলতে দুটিই ছিল, একটি হলো কার্তিক-অগ্রাহায়ণ থেকে চৈত্র-বৈশাখ মাস নাগাদ কৃষিকাজ করা; দুই- বাকি সময়টা মাছ ধরা। তাছাড়া যাদের জমিজামা প্রচুর তাদের এসবের কিছুই ছোঁয় না। আব্দুল করিমের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার জন্য এসবকিছুই তার গানের কলিতে উঠে এসেছে। হয়তো শতবছর পর গ্রাম শহর হয়ে যাবে, মানুষের জীবিকা পরিবর্তিত হয়ে যাবে, ধানক্ষেত খুজে পাওয়া যাবে না, কিন্তু তখন শাহ আব্দুল করিমের গানে ভাটি বাংলার এই চিত্রগুলো ভাসতেই থাকবে। ভবিষ্যতের কথা কে জানে! শাহ আব্দুল করিম গান রচনা করেছেন সৃষ্টির আনন্দে, বিখ্যাত হওয়ার মানসিকতা নিয়ে নয়। অথচ তিনিই বনে গেলেন সমগ্র বাংলাদেশে একজন প্রখ্যাত শিল্পী, দার্শনিক ও চিন্তাবিদ। শাহ আব্দুল করিমের বিভিন্ন গানে ‘ময়ূরপঙ্খী নাও’ এর উল্লেখ আছে বহুবার। তিনি অনেকটা শাব্দিক অর্থের সাথে সাথে রূপক অর্থেও শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এরকম শত শত শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন যার অর্থ দুই রকম দাঁড়ায়। চারিদিকে পানি যখন টইটুম্বুর, হাওর অঞ্চলের মানুষের প্রধান যানবাহন হয়ে উঠে নৌকা। নৌকা ছাড়া কোথাও যাওয়ার কোনো উপায় নাই। অতএব, গানে আছে তারা সন্ধ্যার পর নৌকা নিয়ে হাওরে থাকা পছন্দ করে না এবং সূর্য ডুবে যাওয়া তাদের কাছে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। তবে বাস্তবিক অর্থে যেদিন থেকে বৈদ্যুতিক তার ঢুকেছে হাওরে সেদিন থেকে হাওরের সৌন্দর্য ম্লান হওয়া শুরু হয়েছে বলে আমার ধারণা। কিন্তু সভ্যতা বিকাশের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তাও অনেক। যাহোক, শাহ আব্দুল করিমের গানের বেশির ভাগ শব্দই ভাটি বাংলার সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো মনে করিয়ে দেয় বারবার। যেমন- ‘ময়ূরপঙ্খি নাও’, ‘বইঠা বাওয়া’, ‘পঞ্চায়েত’, ‘জারিগান’, ‘সারিগান’, ‘বাউলাগান’ ইত্যাদি । নির্ভেজাল মানুষ শাহ আব্দুল করিম ঝগড়া পছন্দ করতেন না বলে গানে উল্লেখ করেছেন। পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজনের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখার কথা উল্লেখ করেছেন। একটি গানে উঠে এসেছে ‘গোসসা করার’ কথা, ‘মুরুগ জবো’ করে খাওানোকে ঘিরে কী কী ঘটে যায় তার কথা। হাওর অঞ্চলের মানুষেরা আত্মীয়-স্বজনকে আপ্যায়ন করতে যেসব খাবার আয়োজন করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ঘরের মুরুগ জবাই দিয়ে খাওয়ানো এবং মুরুগ জবাই দেয়ার পর আশেপাশে প্রতিবেশীদের দাওয়াত না দিলে কিংবা অন্তত তরকারি না পাঠালে শুরু হয়ে যায় ‘গোসসার পর্ব’। তখন এক পর্যায়ে ঝগড়াও হয়ে যায়। এই বিষয়টিও শাহ আব্দুল করিম তার গানে ফুটিয়ে তুলেছেন যা গ্রামের মানুষের অতিথি আপ্যায়নের বেলায় বারংবার সম্মুখীন হতে হয়। এরকম অনেক বিষয়েই বিদ্যমান চর্চা ও অভ্যাসগুলো খুব সাবলীলভাবে সাহসিকতার সাথে নিঃসঙ্কোচে প্রকাশ করেছেন শাহ আব্দুল করিম। শাহ আব্দুল করিম গ্রামীণ ঐতিহ্যের যেসব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বারবার গানের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরেকটি হলো গ্রাম্য মেলা। মেলার বর্ণনা বিশদভাবেই গানের কথার মাধ্যমে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যেন মনে হচ্ছে এটি সত্যিকারভাবেই একটি উপভোগ্য বিষয়। এই ক্ষেত্রেও মেলা উপলক্ষ্যে মানুষ মানুষকে সুদমুক্ত ঋণ দেয়ার প্রচলন ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি, ধলমেলার পরিপ্রেক্ষিতে যা লেখা আছে তাতে আবহমান কাল থেকে হাওরের মানুষের জীবনে ঘটে আসা ঐতিহ্য ও কৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছেন। এ ধরনের গানের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহ্য বিলোপের আবহ ফুটিয়ে তুলেছেন এবং সত্যিকার অর্থেই কালের বিবর্তনে হয়তো কবিতা-গান-গল্প ইত্যাদি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা ছাড়া বাস্তবে একসময় আর খুঁজে পাওয়া যাবে না বাউলেপনা, হাওর পাড়ের সংস্কৃতিসহ আরও বিভিন্ন বিষয়। কৃষিকাজ ও কৃষিপণ্যের উল্লেখ পাওয়া যায় আব্দুল করিমের গানে যার বেশির ভাগই এখন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিপন্ন হওয়ার পথে। যেমন- লাঙল, জাল ইত্যাদি। এছাড়া, খাদ্যে ভেজাল ও গ্রামীণ মেলার পণ্যের বিবরণও পাওয়া যায় তার গানের কথায়। ফসল রোপন থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলার কথা বলা আছে। সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত হলে ফলন ভালো হয়, আবার খরা-অতিবৃষ্টির কারণে ফলন নষ্ট হয় এসবের বর্ণনা আছে তার একটি গানে- ‘এবার ফসল ভালো দেখা যায় বা-চাচাজী এবার ফসল ভালো দেখা যায় ফাল্গুনে বর্ষিল মেঘ জমি যাহা চায়-বা চাচাজী।’ একই গানে বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতের বিষয়ে উল্লেখ আছে যা সত্যিকারভাবেই হাওর অঞ্চলের মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। খরা, অকাল বন্যা, অতিবৃষ্টি ,শিলাবৃষ্টি ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষকের স্বপ্নকে কেড়ে নেয়। শাহ আব্দুল করিমের গানে এই বিষয়ের উল্লেখ আছে এভাবে- ‘শিলাবৃষ্টি অকাল বন্যায় বারেবারে ছাতায় রাইত হলে ঘুম ধরে না নানান চিন্তা বা-চাচাজি।। ইরি বোরো ফসল করি আমাদের এলাকায় এক ফসল বিনে আমাদের নাই অন্য উপায়-বা চাচাজী।’ সুনামগঞ্জের হাওরের ফসল প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিভিন্ন সময়েই আঘাত হেনেছে যা মানুষের কাছে প্রতিবারই ফসল তোলার সময়টায় একটা ভয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদী ও নদীপাড়ের জীবনের কথা তার বিভিন্ন গানে পাওয়া যায়। বর্ষাকালে নদী হাওরের পানিতে প্লাবিত হয় তখন নদীকে চেনা দুষ্কর হয়ে পড়ে যেখানে চৈত্রমাসে মেলার সময় মানুষ নদীরপাড়ে বসে থাকত সেখানে বর্ষাকালে নদী চিহ্নিত করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। তবে স্থানীয় মাঝি ও জেলেরা এমনকি ছোট ছোট বাচ্চারাও বলে দিতে পারে নদীর গতিপথ। এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো তার কয়েকটি গানে উল্লেখ আছে যা বাস্তবিক অর্থেই নদী আছে এমন হাওরের জনপদের জন্য জানা পানির মত সহজ । বাউল সাধক শাহ আব্দুল করিমের বাল্যকালের বিভিন্ন বিষয় ফুটে উঠেছে তার গানে। এরই মাধ্যমে ভাটি এলাকার শিশুদের বিনোদন, খেলাধুলার উপকরণ, বেড়ে ওঠার চিত্র খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। এরমধ্যে – বিয়ের গান গাওয়া, ধুলাবালি নিয়ে খেলা, মার্বেল খেলা, পুতুল খেলা, লুকালুকি খেলা ইত্যাদির বর্ণনার সাথে সাথে ছোট ছোট বাচ্চাদের মুখে মুখে প্রচলিত কিছু ভীতিকর বিষয়ের বর্ণনা আছে যেমন- দাঁত পরে গেলে যদি কাকে দেখে ফেলে তো দাঁত আর উঠবে না, কিংবা পোকা ধরা আম খেলে সাঁতার শেখা যায় ইত্যাদি বিষয় এই অঞ্চলের গ্রামের শিশুদের মনের মধ্যে গেঁথে থাকে। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের গানের কথায় গ্রামীণ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষ্টিসহ আবহমান কাল থেকে ঘটে আসা বিষয়গুলোও তার আধ্যাত্মিক চর্চার পাশাপাশি গানের কলিতে উঠে এসেছে। এসব বিষয়াদি কবিতা-গল্প-গানে না থাকলে সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে। ইতোমধ্যেই অনেক বিষয়, ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে যা শাহ আব্দুল করিম জীবদ্দশাতেই বিদ্যমান ছিল অথচ এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে, আশ্চর্যের বিষয় হলো স্বশিক্ষিত শাহ আব্দুল করিম এই বিলুপ্ত হওয়ার প্রক্রিয়া আঁচ করতে পেরেছিলেন এবং তার গানের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় বর্ণনার পাশাপাশি আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন একজন চিত্রশিল্পী যেভাবে নিখুঁতভাবে ছবি আঁকেন ঠিক সেভাবেই। তার প্রয়াণ দিবসে আমরা তার আত্মার শান্তি কামনা করি। (37 বার)

Design & Developed by: Ifad Technology