গ্রামীণ অর্থনীতিতে ছাগল পালনের গুরুত্ব

বুধবার, ০১ মে ২০১৯ | ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ | 106 বার

গ্রামীণ অর্থনীতিতে ছাগল পালনের গুরুত্ব

দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ এখনো গ্রামে বাস করে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গাবাদী পশু পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গবাদীপশুর মধ্যে ছাগল ও ভেড়া পালনকারীদের ৭০ শতাংশ হচ্ছে ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও দরিদ্র কৃষক। ছাগল পালনের মাধ্যমে সমাজের অল্প আয়ের লোকজনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। অন্য গবাদি পশুর তুলনায় ছাগল পালন অনেক সুবিধাজনক। ছাগল পালন করে কম পূঁজিতে, অল্প সময়ে অধিক আয় করা যায়। ছাগলের খাবার খরচও কম। ছাগল ঘাস, লতা-পাতা, ভাতের ফেন, তরিতরকারিও ফলের খোসা, চালের কুড়া, গমের ভূসি প্রভৃতি খাদ্য খেয়ে বেঁচে থাকে। কাঁঠাল পাতা ছাগলের প্রিয় খাদ্য। যে গ্রামে বেশি ছাগল পালন করা হয়, সেই গ্রামে কাঁঠাল গাছ থাকেনা। থাকলেও গাছে পাতা দেখা যায় না। মানুষ বলে ছাগলের মুখে বিষ। ছাগল শাক-সবজি, দানা শস্য ও ফল-ফুল গাছের পাতা খেয়ে নষ্ট করে ফেলে। মাঠের ফসল খাওয়াকে কেন্দ্র করে গ্রামাঞ্চলে ছাগলপালনকারীদের সাথে জমির মালিকদের ঝগড়া-বিবাদ এবং সেই ঝগড়া থেকে মামলা-মোকদ্দমা ও সম্প্রীতি বিনষ্টের বহু নজির আছে গ্রামবাংলায়। মাঠের ফসল খেলে অনেকে ছাগল ধরে খোয়ারে দেয়Ñ এ নিয়েও গ্রামের মানুষের মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। সংখ্যার দিক থেকে ছাগল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ। আর ছাগলের মাংস উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। বিশ্ব বাজারে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের চামড়া ‘কুষ্টিয়া গ্রেড’ নামে পরিচিত। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসেবে সারা দেশের ঘরে ঘরে পালিত ছাগলের সংখ্যা ২ কোটি ৫৪ লাখ ৩০ হাজার, যার প্রায় ৯৫ শতাংশই ব্ল্যাক বেঙ্গল। দেশের প্রায় এ কোটি লোক ছাগল পালন করেন। বাংলাদেশের সব জেলাতে কমবেশি ছাগল পালন করা হলেও চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর জেলায় বেশি ছাগল পালিত হয়। ওয়েব ফাউন্ডেশনের হিসাবে শুধু চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও রাজশাহীতে ২০ হাজার খামারে প্রায় ৫০ লাখ ছাগল লালন-পালন করা হচ্ছে। ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার ১২ টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ১০ থেকে ১২ হাজার পরিবার ৩৫ হাজার ছাগল প্রতিপালন করছেন। একক কোনো প্রাণী পালনের ক্ষেত্রে এটাই সর্বোচ্চ রেকর্ড। গত ৫ বছরে দেশে ৬০ লাখ ছাগল উৎপাদিত হয়েছে।

বাংলাদেশের এই জাতটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং ডিএনএ পরীক্ষা করে দীর্ঘ নয় বছর গবেষণা করেছে জাতিসংঘের আণবিক শক্তি বিষয়ক সংস্থা ইন্টার ন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। ২০০৭ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংস্থা দুইটি বিশ্বের ১০০ টি জাতের ছাগলের ওপর গবেষণা করে ব্ল্যাক বেঙ্গলকে অন্যতম সেরা জাত হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। এফএও এবং আইএইএ -এর ওই সমীক্ষার সাথে যুক্ত বাংলাদেশী বিজ্ঞানীরা বলছেন, অন্য ৯৯টি জাতের সব ধরনের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তুলনা করলে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলই সবার সেরা। বাংলাদেশে এই ছাগলের নবজাতকের মৃত্যু হার অনেক কম। প্রজননে উর্বর ব্লাক বেঙ্গল জাতের ছাগল প্রতিবার দুই থেকে তিনটি করে বছরে চার থেকে ছয়টি বাচ্চা দেয়। এর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো- এটি পালন করতে কোনো চারণ ভূমির প্রয়োজন হয় না। বাড়ির উঠান বা রান্না ঘরের পাশের ছোট স্থানেও এরা দিব্যি বেড়ে উঠে। তবে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের দুর্বল দিক হলো- এর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-ওজন এবং দুধের পরিমাণ অন্য জাতের ছাগলের তুলনায় খুব কম। আফ্রিকার মাসাই, ভারতের যমুনাপাড়ি ছাগল ও চীনের ছাগলের মাংস ও দুধের পরিমাণ ব্ল্যাক বেঙ্গলের চেয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ বেশি। তবে ওই তিন জাতের ছাগলের ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ বাচ্চা জন্মের পরপরই মারা যায়। কিন্তু ব্ল্যাক বেঙ্গলের বাচ্চার মৃত্যুর হার ৫ থেকে ১০ ভাগ। এক বছর বয়সের একটি ব্লাক বেঙ্গল খাসি থেকে ৬ থেকে ৮ কেজি মাংস পাওয়া যায়। প্রতি কেজি মাংসের দাম ৭০০ টাকা হলে এক বছর বয়সের একটি খাসির দাম দাঁড়ায় ৪ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ৬০০ টাকা। অপরদিকে বগুড়া সদরের বানদিঘি পূর্বপাড়ার ছাগলের খামারি আলহাজ আব্দুল হান্নানের মতে, একটি পরিপূর্ণ ছাগল হতে ১৪ মাস সময় লাগে। এ ১৪ মাস ঠিকমতো লালন-পালন করলে খাসির ওজন দাঁড়ায় ১৬ থেকে ১৭ কেজি, যা বিক্রি করে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গবেষণা করে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ২,৩ বা ৪টি ছাগল পালন করে বছরে গড়ে যথাক্রমে ৩১৫০, ৪১৫০ও ৫৩৭৩ টাকা আয় করা সম্ভব।

গ্রামাঞ্চলে অনেক ছেলে- মেয়ে আছে , যারা ছাগল পালন করে পড়াশোনার খরচের টাকা জোগার করে। পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় অনেক গরীব ঘরের ছাত্রÑছাত্রী ছাগল বিক্রি করে প্রয়োজনী অর্থের সংস্থান করে।বিপদ আপদে ও অসুখে-বিসুখে এই ছাগল বিক্রির অর্থই গ্রামের গরীব মানুষের একমাত্র অবলম্বন হয়ে থাকে। ছাগলের মল-মুত্র ফসলের জমিতে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ব্লাক বেঙ্গল ছাগলের চামড়া থেকে উন্নত মানের জুতা, ব্যাগসহ নানা রকম পণ্য প্রস্তুত করা হয়।

ছাগল পালন প্রযুক্তির দিক থেকেও বাংলাদেশ বেশ কিছু সফলতা অর্জন করেছে।পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের সহায়তায় ২০০৮ সালে মাচায় ছাগল পালনের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন এবং ছাগলের মৃত্যু কমানোর জন্য ‘ লিফট’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ওয়েব ফাউন্ডেশন নামের একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা ওই প্রকল্পের ছাগলের মৃত্যু হার চুয়াডাঙ্গা জেলায় গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০ থেকে ৫ শতাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এ সময় চুয়াডাঙ্গা জেলায় ছাগলের সংখ্যাও বেড়েছে ৩০ শতাংশ এবং সারা দেশে উপজেলা প্রতি ছাগলের সংখ্যা গড়ে ১৭১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণত মুত্র পায়ে লেগেই ছাগলের ক্ষুরা রোগ হয় এবং জীবনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মাচা পদ্ধতিতে মুত্র নিচে পড়ে যায় বলে এই রোগের প্রকোপ কমে যায়।

ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলে জাত উদ্ভাবনে গবেষণা চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট। দেশীয় জাতের এ ছাগলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এর মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন সহজ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ৪৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬টি জেলায় ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালনের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। জেলাগুলো হলো- ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, মেহেরপুর, বান্দরবান, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা। ইতোমধ্যে প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। সম্প্রতি প্রকল্প প্রস্তাবের ওপর মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় প্রকল্পটি প্রাথমিকভাবে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় উপস্থাপন করা হবে বলে জানা যায়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তরা জানান, সম্ভাবনাময় জেনেটিক সম্পদ হিসেবে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে ছাগল মূলত মাংস ও চামড়ার জন্য বিখ্যাত। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল ক্ষুদ্র খামারিদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। দেশে পালিত অধিকাংশ ছাগলই ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের। এছাড়া ভারতের যমুনাপাড়ি নামের (রাম ছাগল) অল্প পরিমাণে কিছু উন্নত জাতের ছাগল পালন করা হয় বাংলাদেশে। এসব ছাগল থেকে অধিক পরিমাণ মাংস পাওয়া যায় এবং পালন খরচও তুলনামূলক বেশি। তবে যমুনাপাড়ি জাতের ছাগলের মাংসের চেয়ে ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগলের মাংসের স্বাদ ও দাম বেশি । এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালনে সহজ প্রযুক্তিগুলো মাঠ পর্যায়ে হস্তান্তর করা সহজ হবে। এতে দেশীয় ছাগল সংরক্ষণ সহায়ক হবে এবং সংখ্যা বাড়বে। এর মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং নারী ও যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তরা জানান, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের ওপর ভিত্তি করে মাথা পিছু সরবরাহ নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে ধান উৎপাদন বৃদ্ধি করা হয়েছে। বৃদ্ধি করা হয়েছে শাক-সবজিও ফলমূলে উৎপাদন। কিন্তু প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। গুণগতমান সম্পন্ন আমিষের প্রধান উৎস হলো গবাদি পশু। আমিষের অভাব মানুষের শারীরীক ও মানসিক মেধা বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। ছাগলের দুধ ও মাংসের মাধ্যমে গুণগত মানের আমিষ পাওয়া যায়।এ কারণে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের এই প্রকল্পটি গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

ছাগল পালনে লাভবান হতে হলে ছাগলকে রোগমুক্ত রাখতে হবে। ছাগলের ক্ষতিকারক রোগের মধ্যে পিপিআর, ক্ষুরা রোগ, গোটপক্স, নিউমোনিয়া, এনথাইমা ও ক্রিমি উল্লেখযোগ্য। ছাগলকে রোগবালাই থেকে মুক্ত রাখতে হলে যে সব বিষয়গুলির প্রতি অবশ্যই যত্নবান হতে হবে সেগুলো হলোÑ এক. ছাগলের ঘর নিয়মিত পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। দুই.ঘর যাতে ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তিন. নতুন ছাগল আনার পর অন্তত ৭ দিন আলাদা রাখতে হবে। চার. ছাগলকে সময় মতো টিকা দেয়া ও কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়াতে হবে। পাঁচ. কোনো রোগের লক্ষণ দেখা দিলে রোগাক্রান্ত ছাগলকে আলাদা রাখতে হবে। ছয়. রোগাক্রান্ত ছাগলকে দ্রুত পশু চিকিৎসকের নিকট নিতে হবে। সাত. রোগের কারণে মৃত ছাগলকে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। আট . নিয়মিত ছাগলের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে এবং ছাগলকে সুষম খাদ্য ও পানি সরবরাহ করতে হবে।

দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠি স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে ছাগল পালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারে। ছাগল ভূমিহীন কৃষক ও দুস্থ নারীদের আাত্মকর্মসংস্থানে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। পিপিআর রোগের কারণে প্রতিবছর দেশে অনেক ছাগল মারা যায়। তাই সরকারি পশু হাসপাতাল হতে বিনা মূল্যে এই রোগের টিকা সরবরাহ এবং ছাগল পালনের জন্য স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সাথে ছাগলপালনকারীদের সুরক্ষার জন্য পশুবিমা প্রচলন এবং বিমার কিস্তির টাকা ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করতে হবে।

————————————–

লেখকঃ পরিচালক, কৃষি প্রযুক্তি কেন্দ্র ত্রিশাল পৌরসভা, ময়মনসিংহ।

মোবাইলঃ ০১৭২২৬৯৬৩৮৭

ইমেইলঃ netairoy18@yahoo.com

ইন্ডিয়া বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ ক্লাব ঢাকা লিমিটেড এর যাত্রা শুরু

Design & Developed by: Ifad Technology