ঢাকা, বুধবার, ২১শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের অধ্যাদেশ জারি

বিচার নিশ্চিতই চ্যালেঞ্জ

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ মঙ্গলবার এ অধ্যাদেশ জারি করে।

এর আগে সোমবার মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া সংশোধনী প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ স্বাক্ষর করেন। একের পর এক যৌন নিপীড়নের ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদ আর বিক্ষোভের মধ্যে ‘জরুরি’ বিবেচনায় আইনটি সংশোধন করে তা অধ্যাদেশ আকারে জারি করল সরকার।

তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন- অধ্যাদেশ, আইন যাই হোক না কেন- আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, তবেই ধর্ষণের মাত্রা কমবে। বাস্তবতা হচ্ছে, ধর্ষণের মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে, তদন্ত শেষ হয় না।

বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই মূলত ধর্ষণ ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে। যতই কঠোর আইন করা হোক না কেন, এর সঠিক প্রয়োগ না হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না। সুফল আসবে না নতুন আইনের।

এ মুহূর্তে সংসদ অধিবেশন বন্ধ থাকায় সংশোধিত প্রস্তাবিত আইনটি অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হয়। জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে অধ্যাদেশটি উপস্থাপন করতে হবে। আইনটি বলবৎ রাখতে চাইলে পরে বিল আকারে তা আনবে সরকার।

২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি এতদিন ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আর ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে বা দলবেঁধে ধর্ষণের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

পাশাপাশি দুই ক্ষেত্রেই রয়েছে অর্থদণ্ডের বিধান। এ আইনে শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করার পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে বিচার ও রায় কার্যকর করার জন্য আইন সংশোধনের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই করা হচ্ছিল বিভিন্ন সংগঠনের তরফ থেকে।

সম্প্রতি নোয়াখালীতে বিবস্ত্র করে নির্যাতন ও সিলেটের এমসি কলেজে তুলে নিয়ে ধর্ষণসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যৌন নিপীড়নের ঘটনার প্রেক্ষাপটে দেশজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে সেই দাবি আবারও জোরালো হয়ে ওঠে।

এ অধ্যাদেশ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২০ নামে পরিচিত হবে।

নতুন অধ্যাদেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বিশিষ্ট ফৌজদারি মামলা বিশেষজ্ঞ খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, সাজা বাড়ালেই ধর্ষণ কমবে বিষয়টি এমন নয়। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা এখন আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি বলেন, সঠিক তদন্তের অভাবে অনেক সময় প্রকৃত অপরাধী পার পেয়ে যায়। বর্তমানে ধর্ষণ মামলা বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ হচ্ছে অপরাধীদের নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও প্রভাবশালীদের আশীর্বাদ।

ক্ষমতাসীন দলের সদস্য হওয়ায় তারা (ধর্ষক) মনে করে আমাদের সাজা হবে না। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের লোকজনও প্রভাবিত হন। এ কারণে অনেক সময় সঠিক তদন্ত হয় না।

তাড়াহুড়ো করে চার্জশিট দেয়ায় মূল আসামি বাদ পড়ে যায়। এরপর সাক্ষ্যপ্রমাণের যথেষ্ট অভাব থাকে। সাক্ষ্য দিতে অনেকে সাহস পান না। এজন্য আমাদের নির্ভর করতে হবে সঠিক ডিএনএ ও মেডিকেল টেস্টের ওপর।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে, এটাকে আমি ইতিবাচক মনে করি। যখন কোনো আইন হয়, তখন এর একটা উদ্দেশ্য থাকে।

সেটাকে বাস্তবায়নের সুযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, এখন দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। ধর্ষণ, নারী নির্যাতনের বিচার কতদিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে সেটা আইনে নির্দিষ্ট করে দিতে হবে।

আর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করতে না পারলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক যুগান্তরকে বলেন, ধর্ষণ নিয়ে সৃষ্ট প্রতিবাদ শান্ত করার জন্যই শাস্তি বাড়ানো হয়েছে। শুধু শাস্তি বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না, আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, শাস্তি নিশ্চিতে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি করা। দেশে মাত্র ১৮শ’ বিচারক দিয়ে ১৮ কোটি মানুষের বিচার সম্ভব নয়। সময়মতো সাক্ষী হাজির করা এবং তদন্তের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করায় সমাজে এর একটা প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ফৌজিয়া করিম। তিনি যুগান্তরকে বলেন, মৃত্যুদণ্ডের বিধান হওয়ায় আমার আশঙ্কাও রয়েছে।

এমনিতেই ধর্ষণের সাক্ষী পাওয়া যেত না, মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় এখন সাক্ষীদের মধ্যে আরও ভীতির সৃষ্টি করবে।

কারণ ধর্ষকরা বেশিরভাগই এলাকার প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক কর্মী। তাই ভিকটিমের সুরক্ষা এবং সাক্ষী সুরক্ষা আইন করা খুবই প্রয়োজন। গত ১৭ বছরে এ আইনটি না হওয়া দুঃখজনক।

অধ্যাদেশে যা আছে : ২০০০ সালের আইনের ৯ নম্বর ধারার ১ উপধারায় শাস্তির বিষয়ে বলা হয়েছিল, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।

সংশোধিত অধ্যাদেশে ‘যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘মুত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ২০০০ সালের আইনের ৯ নম্বর ধারার ৪(ক) উপধারায় বলা হয়েছিল, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করিয়া মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন। সংশোধিত অধ্যাদেশে এখানেও ‘যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

২০০০ সালের আইনের ৩২ ধারায় বলা ছিল, এ আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধের শিকার ব্যক্তির সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া মেডিকেল পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে কিংবা সরকার কর্তৃক এতদুদ্দেশ্যে স্বীকৃত কোনো বেসরকারি হাসপাতালে সম্পন্ন করা যাইবে।

সংশোধিত অধ্যাদেশে অপরাধের শিকার ব্যক্তির পাশাপাশি ‘অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির’ মেডিকেল পরীক্ষা করার বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ৩২ ধারার সঙ্গে ৩২ক শিরোনামে নতুন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে অধ্যাদেশে।

সেখানে বলা হয়েছে, এ আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তির ধারা ৩২-এর অধীন মেডিকেল পরীক্ষা ছাড়াও, উক্ত ব্যক্তির সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, ২০১৪ সালের ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) আইনের বিধান অনুযায়ী তার ডিএনএ পরীক্ষা করিতে হইবে।