বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা কতটা আন্তর্জাতিক মানের

রবিবার, ২৬ মে ২০১৯ | ৬:১৩ অপরাহ্ণ | 15 বার

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা কতটা আন্তর্জাতিক মানের

গত তিন সপ্তাহে সংবাদমাধ্যমগুলোতে এমন কিছু সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, যা উচ্চশিক্ষায় অনুরাগীদের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। জন্ম দিয়েছে তর্ক-বিতর্ক ও মনঃকষ্ট। এসব সংবাদের মধ্যে রয়েছে- ‘এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নেপালও আছে, বাংলাদেশ নেই’ (দ্য ডেইলি স্টার, ৭ মে ২০১৯), ‘কোটি টাকার গাড়ি পাচ্ছেন ইউএনওরা’ (জাগো নিউজ২৪.কম, ৮ মে ২০১৯), ‘নকলে বাধা, শিক্ষককে পেটালো ছাত্ররা’ (ইউটিউব), ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হতে পিএইচডি বাধ্যতামূলক’। উপরে উল্লিখিত প্রথম সংবাদটি প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাসংশ্নিষ্ট মানুষের মধ্যে শোরগোল বেধে গেল। তারা যেন খুবই অবাক হয়েছেন এমন সংবাদে। সংবাদমাধ্যমে ভিসি মহোদয়বর্গের সাক্ষাৎকারের কারণে সংবাদটির প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। পরে দায়িত্বশীল দু-একজনের বিতর্কিত মন্তব্য এ সংবাদের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও বিরক্তির নতুন মাত্রা তৈরি করেছে।

ব্যাপারটা এমন নয় যে ‘দ্য টাইমস হায়ার এডুকেশন’ এবারই প্রথম ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিগুলোর র‌্যাংকিং করেছে। বরং প্রতি বছরই টাইমস হায়ার এডুকেশন বিশ্বের আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং করে থাকে। কিন্তু এ বছর এশিয়ার ৪১৭টি সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নেপাল, পাকিস্তান, ভারত ও শ্রীলংকার বিশ্ববিদ্যালয় সেরার তালিকায় স্থান পেলেও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সে তালিকায় নেই। এর ব্যাখ্যায় বিশিষ্টজন বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মনে করেন, পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে র‌্যাংকিং করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক উপরে থাকত।’ (ডেইলি বাংলাদেশ বার্তা)। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক উপাচার্য মনে করেন, ‘এই র‌্যাংকিংটা যেভাবে করা হয়েছে তাতে হয়তো আমরা পিছিয়ে রয়েছি। তবে ঠিক রিভার্স র‌্যাংকিংয়ে গেলে আমরা এগিয়ে যাব।’ (ডেইলি স্টার)। ড. কায়কোবাদ বিষয়টিকে দেখেছেন অন্যভাবে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান খারাপ এবং এ জন্য তিনি শিক্ষায় রাজনীতিকে দায়ী করেন। অন্যদিকে ইউজিসির সদ্য সাবেক হওয়া চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধি করতে হলে সার্টিফিকেট বিক্রি বন্ধের পরামর্শ দেন।

এ বিষয়টির গভীরে যাওয়ার আগে জানা দরকার ‘দ্য টাইমস হায়ার এডুকেশন’ কোন মানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং করে, কোন কোন ইন্ডিকেটরের আলোকে র‌্যাংকিং করে এবং সেসব ইন্ডিকেটরের আলোকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার অবস্থান কোথায়। সাধারণত টাইমস হায়ার এডুকেশন সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং করে থাকে, যেগুলো আন্তর্জাতিক মানের। এখন প্রশ্ন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা কতটা আন্তর্জাতিক মানের? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য জানতে হবে কোন কোন কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানের হয়? অন্যভাবে বললে বলা যায়, হোয়াট মেকস আ ইউনিভার্সিটি ‘ইন্টারন্যাশনাল’? যে নির্ধারকগুলো একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিকতায় রূপ দেয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ক) আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী রিক্রুট, খ) আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জন, গ) শিক্ষাক্রম ও প্রোগ্রামকে আন্তর্জাতিকতায় রূপ দেওয়া, ঘ) বহির্বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রচার ও প্রসার ঘটানো, ঙ) সরকারি নীতিমালায় বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক করার পলিসি থাকা, চ) নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি, ছ) শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নতকরণ, জ) শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বহির্বিশ্বে গমনাগমন থাকা, ঝ) বিশ্ববিদ্যালয়টির আন্তর্জাতিক অবস্থান থাকা, ঞ) বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিকতার পরিবেশ তৈরি ট) বৈশ্বিক বা সামাজিক সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখা ইত্যাদি।

উপরে উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যের আলোকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, বিদেশি শিক্ষার্থী এনরোলমেন্টে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক এগিয়ে। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। ইউজিসি রিপোর্ট বলছে, ২০১৬ সালে দেশের ১৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ৩৫৫ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করেছে, সেখানে ৩৪টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২৭ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করেছে। এসব শিক্ষার্থীর অধিকাংশই আসছে আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলো থেকে। তুলনামূলক কম খরচ, সুবিধাজনক জলবায়ু ও পরিবেশ, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পেইন, পৃথক আবাসন ব্যবস্থা, ইংরেজি ক্লাসরুম শিক্ষার মাধ্যম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রাখলেও এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় মোটেও সন্তোষজনক নয়।

অনুরূপভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক বিদেশে পড়াশোনা করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জন করলেও দেশে এসে সেই জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তাদের খুবই সীমিত। বরং বিদেশফেরত শিক্ষকদেরও একটি অংশ দেশে ফিরে তাদের অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ না পেয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। অনেকে আবার দেশেই ফিরছেন না। ফলে দেশের মেধা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্বাক্ষর করলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা কার্যকর রূপ লাভ করে না। অন্যদিকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বের আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন প্রতিনিয়ত তাদের কোর্স কারিকুলামকে আপডেট করছে; বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদালয়গুলো এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। বরং মার্কেট ডিমান্ড যাচাই না করেই কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এমন কিছু বিষয় খুলছে, যা বেকারত্বই সৃষ্টি করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাক্রম নেই বললেই চলে। সম্প্রতি উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে হেকেপ (HEQEP) প্রজেক্টের কারণে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষাক্রম তৈরি করতে সক্ষম হয়। তবে গুণগত মানে যুগের চাহিদায় এখনও তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

একইভাবে স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ফর হায়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ ২০১৮-২০৩০-এ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তব ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা খুব একটা দৃশ্যমান নয়। বরং এ পরিকল্পনার অনেক নীতি উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকতা তৈরির পরিপন্থি। যেমন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরকার নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয় করার নীতিমালা, উচ্চশিক্ষাকে আমলানির্ভর করার প্রচেষ্টা, গবেষণা ফান্ডের স্বল্পতা, ‘ফ্ল্যাগশিপ বিশ্ববিদ্যালয়’ তৈরির নীতি এর অন্যতম। শুধু তাই নয়, হাতেগোনা কয়েকটি এলিট প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচার ও প্রসার ঘটানোর প্রচেষ্টা নেই বললেই চলে। এসব প্রচার ও প্রসারে কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তাগিদ অনুভব করলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভুলেও তেমনটা অনুভব করে না। তাগিদ অনুভব করে না শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক প্রোগ্রাম, প্রতিযোগিতা ও কনফারেন্সে অংশগ্রহণে প্রয়োজনীয় একাডেমিক ও অর্থনৈতিক সাপোর্ট দিতে। বিদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তেমন আমন্ত্রণও করে না, খরচের ভয়ে।

একইভাবে গবেষণা নিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত টিচিং বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় নয়। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় হতে গেলে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা হওয়া দরকার। তেমনি আন্তর্জাতিক গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত ফান্ডও দরকার। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ফান্ড বরাবরই অপ্রতুল। উচ্চশিক্ষায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে যেখানে মূল বাজেটে ৬৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে, সেখানে মাঠ পর্যায়ের ইউএনওদের ১০০টি গাড়ি কেনার প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়, যেখানে প্রতিটি গাড়ির মূল্য ৯১ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ ধরনের সিদ্ধান্তই ইঙ্গিত বহন করে যে, উচ্চশিক্ষা গবেষণায় অর্থায়ন কতটা অবহেলিত। কিন্তু ভালো ফান্ড দিলে এখনও ভালো গবেষণা হয়- ‘হেকেপের একাডেমিক ইনোভেশন ফান্ড’ তার যথেষ্ট প্রমাণ রেখেছে। অন্যান্য বিষয় আর নাইবা বললাম।

উপরোক্ত বিষয়গুলো বিশ্নেষণের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খুব একটা আন্তর্জাতিক মানের নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অন্ধ দলীয় রাজনীতির হিংস্র থাবা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান ক্রমাগত নিম্নমুখী করছে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নিম্নমুখী এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে খুব একটা মানসম্মত নয়, সেখানে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকা অস্বাভাবিক নয়, বরং এটাই বাস্তবতা। কারণ আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে যে বিষয়গুলো দেখা হয়- ক) শিক্ষণ-শিখন পরিবেশ, খ) গবেষণা, ভলিউম, আয় এবং খ্যাতি, গ) সাইটেশন গবেষণার প্রভাব, ঘ) আন্তর্জাতিক আউটলুক- স্টাফ শিক্ষার্থী ও গবেষণা, ঙ) ইন্ডাস্ট্রি আয়-নলেজ ট্রান্সফার। এর কোনোটাতেই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার খুব একটা সাফল্য রয়েছে, বলা যায় না। বরং ক্রমাগত রয়েছে হতাশা ও বিরক্তির ছাপ। আছে শিক্ষক লাঞ্ছনার মতো লজ্জাজনক দৃষ্টান্ত। এত হতাশা ও লজ্জার মধ্যেও কিছু পদক্ষেপ আশার আলো ছড়ায়। তার মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক নিয়োগে পিএইচডি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক। হেকেপের মতো সচেতনতা সৃষ্টিকারী প্রজেক্ট নেওয়া এবং এরই ধারাবাহিকতায় হিট (Heat) প্রজেক্ট শুরু করা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিংয়ের উদ্দীপনা জাগ্রত করা, তরুণ শিক্ষকদের মধ্যে ভালো মানের প্রকাশনা করার চেষ্টা করা। সঠিক একাডেমিক ভিশন ও মিশন নিয়ে সরকার, ভিসি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সংশ্নিষ্ট ইন্ডাস্ট্রি একত্রিত হয়ে কাজ করলে শুধু এশিয়া কেন; বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ের ইম্পসিবল মিশনকে সফল করা সম্ভব। বাংলাদেশ সৃষ্টির সফলতা তো সেখানেই।

সহযোগী অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
moninoor@du.ac.bd

ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করে অসংখ্য তরুণীকে দিনের পর দিন ধর্ষণকারী ভুয়া ডাক্তার গ্রেফতার!

Development by: Creative it Solution