নুসরাতের মতো ‘সৌভাগ্য’ নেই জান্নাতির পরিবারের

বুধবার, ১২ জুন ২০১৯ | ৭:৩৩ পূর্বাহ্ণ | 15 বার

নুসরাতের মতো ‘সৌভাগ্য’ নেই জান্নাতির পরিবারের
মৃত্যুর আগে হাসপাতালে জান্নাতি আক্তার। ছবি : সংগৃহীত

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দুই মাসের মধ্যে সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ওই মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ ও অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ২০ জুন দিন ধার্য করেছেন সেখানকার আদালত। সরকারের তড়িৎ পদক্ষেপে নুসরাতের পরিবার আশা করছে, তারা দ্রুত ন্যায়বিচার পাবে।

কিন্তু নুসরাতের পরিবারের মতো সৌভাগ্য হয়নি নরসিংদীর দশম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতি আক্তারের (১৬) পরিবারের। কেরোসিন ঢেলে জান্নাতিকে পুড়িয়ে হত্যার পৌনে দুই মাস পার হলেও হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা হয়নি। আদালতে মামলা হলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি পিবিআই। এদিকে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে জান্নাতির হত্যাকারীরা। হত্যাকারীদের অব্যাহত হুমকির মুখে ভয়ে ও আতঙ্কে দিন কাটছে জান্নাতির পরিবারের সদস্যদের।

ঢাকায় ফেরি করে চা বিক্রি করেন নিহত জান্নাতির বাবা শরীফুল ইসলাম খান। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে নরসিংদী সদর উপজেলার হাজিপুর গ্রামের একটি কুটিরে বসবাস করছেন। দাদার মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও বাবার চা বিক্রির টাকায় চলে তাঁদের সংসার।

পুলিশ ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক বছর আগে হাজিপুর গ্রামের স্কুলছাত্রী জান্নাতি আক্তারের সঙ্গে পাশের খাসের চর গ্রামের হুমায়ুন মিয়ার ছেলে শিপলু মিয়ার প্রেম হয়। কিছুদিন পরই পরিবারের অমতে তারা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেন। বিয়ের কিছুদিন যেতে না যেতেই স্বামীর আসল রূপ বেরিয়ে আসে। স্ত্রী জান্নাতিকে পারিবারিক মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত করতে শাশুড়ি শান্তি বেগম ও স্বামী শিপলু তাকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। এতে রাজি হয়নি জান্নাতি। তাই তার ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। এরপর শ্বশুরবাড়ির লোকজন পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। দরিদ্রতার কারণে যৌতুকের দাবি মিটাতে পারেননি জান্নাতির বাবা। ফলে জান্নাতির ওপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। যৌতুকের টাকা না দেওয়া ও মাদক ব্যবসায় জড়িত না হওয়ায় গত ২১ এপ্রিল রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় স্বামী শিপলু, শাশুড়ি শান্তি বেগম ও ননদ ফাল্গুনী বেগম জান্নাতির শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেন। দগ্ধ হয়ে ছটফট করলেও তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়নি তারা। পরে এলাকাবাসীর চাপে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ ৪০ দিন যন্ত্রণার পর গত ৩০ মে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহত জান্নাতির বাবা শরীফুল ইসলাম খান বলেন, মেয়ের শরীরে আগুন দেওয়ার পর পরই থানায় মামলা করতে যাই। কিন্তু পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে আদালতে মামলা দায়ের করি। আদালত থেকে পিবিআইকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তারা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেনি। এদিকে হত্যাকারীরা অব্যাহতভাবে আমাদের পরিবারকে ভয়-ভীতি ও হুমকি দিচ্ছে। মামলা করলে আমার ছোট মেয়েকে তুলে নিয়ে যাবে। একই সঙ্গে আমাদের সবাইকে প্রাণে মেরে ফেলবে বলেও হুমকি দিচ্ছে।

জান্নাতির মা হাজেরা বেগম বলেন, মেয়েটাকে ফুসলিয়ে তারা তুলে নিয়ে যায়। সে যখন তার ভুল বুঝতে পেরেছে, তখন তাদের বাড়ি থেকে চলে এসেছে। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির লোকজন জোর করে তাকে নিয়ে যায়। আমরা গরিব। তাই বাধা দিয়ে রাখতে পারিনি।

হাজেরা বেগম আরো বলেন, জান্নাতির শ্বশুরবাড়ির লোকজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। তাই তারা পুলিশ ও আইনকেও তোয়াক্কা করে না। তাদের বিরুদ্ধে ১০-১২টি মামলা আছে। রয়েছে পুলিশের সঙ্গে সখ্য। তাই পুলিশ আমাদের মামলা নেয়নি।

এদিকে মৃত্যুর আগে আগুন দিয়ে পোড়ানোর বর্ণানা দিয়ে গেছে জান্নাতি। তার আর্তনাদ কেঁপে উঠেছিল পুরো হাসপাতাল চত্বর। পাশের বেডে থাকা এক রোগী ভিডিও ধারণ করেছে তার করুণ আর্তনাদ। সেখানে দেখা গেছে, মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছিল সে। তীব্র ব্যথা সইতে না পেরে দরিদ্র বাবার কাছে ব্যথানাশক একটি ইনজেকশন দেওয়ার দাবি জানায়। সেখানে সে বলছিল, ‘তোমার কাছে জীবনে আর কিছুই চাইব না বাবা। একটি ব্যথানাশক ওষুধ দাও।’ কিন্তু দরিদ্র বাবা সেই ইনজেকশন কিনে দিতে পারেননি।

জান্নাতির বাবা বলেন, একটি ইনজেকশনের দাম সাত হাজার টাকা। আরেকটির দাম তিন হাজার ৮০০ টাকা। আমি দরিদ্র চা বিক্রেতা। এত টাকা পাব কোথায়? তাই মেয়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে পারিনি। ধার-কর্জ ও ঋণ নিয়ে যত দিন ওষুধ দিতে পেরেছি তত দিন বেঁচে ছিল। এরপর আর মেয়েকে বাঁচাতে পারিনি। এখন শুধু একটাই দাবি। হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।

বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফয়সাল সরকার বলেন, নরসিংদীতে ফেনীর নুসরাতের মতো আরো একটি ঘটনার জন্ম নিয়েছে। চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটলেও থানা পুলিশ মামলা নেয়নি। বাধ্য হয়েই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি।

আদালত সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বললেও পিবিআই পুলিশ তা দেয়নি। তাই মামলার কর্যক্রম বিলম্ব হচ্ছে। আসামিও গ্রেপ্তার হচ্ছে না।

নিহত জান্নাতির দাদা বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম খান বলেন, জীবন দিয়ে মাদককে না করে গেছে আগুনে দগ্ধ জান্নাতি। প্রেমের টানে ঘর ছাড়লেও যৌতুক ও মাদক ব্যবসার কাছে নতি শিকার করেনি। তার মাদক ব্যবসায়ী স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কঠোর বিচার চাই। জান্নাতির মতো করুণ পরিণতি যেন আর কারো না হয়।

নরসিংদীতে পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ আর এম আলিফ বলেন, সিআর (আদালতে মামলা) মামলা তদন্ত করতে একটু সময় লাগে। তার ওপর এটি একটি হত্যা মামলা। ঘটনাটিও বড়। তাই স্বচ্ছ ও পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষভাবে সঠিক চিত্র উঠিয়ে আনতেই সময় লাগছে। এরই মধ্যে আমরা প্রাথমিক তদন্তে জান্নাতির গায়ে আগুন দেওয়া ও পরে হত্যার ঘটনার সত্যতা পেয়েছি। আরো কিছু বিষয় আছে। সেগুলো শেষ হলেই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হবে।

আসামিদের গ্রেপ্তার করা প্রসঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, সিআর মামলায় পিবিআইয়ের গ্রেপ্তার করার বিধান নেই। তবে আদালত ওয়ারেন্ট ইস্যু করলে আমরা গ্রেপ্তার করতে পারি।

Development by: Creative it Solution

error: Content is protected !!